হার্টের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি স্টেন্ট রোগীর শরীরে বসানোর আগে সেটি কোথা থেকে এসেছে, কে আমদানি করেছে, সেটি অনুমোদিত কি না কিংবা এর মান কেমন-এসব জানার অধিকার রোগী ও তাঁর স্বজনদের।
অস্ত্রোপচারের পর পণ্যের প্যাকেট ও বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার কথাও তাঁদের। কিন্তু বাস্তবে অনেক রোগীই জানেন না, তাঁদের হৃদয়ে কোন কোম্পানির স্টেন্ট বসানো হয়েছে।
অস্ত্রোপচারের পর পণ্যের প্যাকেটও তাঁদের হাতে দেওয়া হয় না।
এই অন্ধকারের সুযোগেই গড়ে উঠেছে হৃদরোগ চিকিৎসা সরঞ্জামের এক ভয়ংকর অবৈধ বাণিজ্য।
অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে চোরাইপথে দেশে ঢুকছে স্টেন্ট বা হার্টের রিং, বেলুন ক্যাথেটার, গাইড ওয়্যার, গাইড ক্যাথেটার, ওয়াই-কানেক্টর, ম্যানিফোলড ও শিথ টাইগার ক্যাথেটারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম।
পরে নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব পণ্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করা হচ্ছে।
অভিযোগের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এই বাণিজ্যের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন নামিদামি হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়েছেন। প্রতিটি স্টেন্ট ব্যবহারের বিপরীতে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ফলে রোগীর জন্য কোন স্টেন্টটি চিকিৎসাগতভাবে সবচেয়ে উপযোগী, সেই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কমিশনের অঙ্কও প্রভাব ফেলছে কি না-সেই প্রশ্ন উঠছে জোরালোভাবে।
অনুসন্ধানে এমন ৫০ রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে, যাঁদের হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
গত ছয় মাসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ব্যবহৃত হৃদরোগ চিকিৎসা সরঞ্জামের মধ্যেও অবৈধভাবে দেশে আনা পণ্যের প্রমাণ পাওয়ার দাবি উঠেছে।
এমন অভিযোগ শুধু রোগীর আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়। চিকিৎসা সরঞ্জামের মান, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা সরাসরি রোগীর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব।
সামনে মাসুদ, পেছনে বিস্তৃত নেটওয়ার্কের অভিযোগ
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই অবৈধ বাণিজ্যচক্রের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে মাসুদুর রহমানের নাম।
তিনি হার্টের রিং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দ্য স্পন্দন লিমিটেডের সাব-ডিস্ট্রিবিউটর এবং বোস্টন সায়েন্টিফিকের সাব-ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে পরিচিত।
এর বাইরে তাঁর নামে রিদম মেডিকেল ইন্টারন্যাশনাল, ভারটেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও থ্রিএফ ইন্টারন্যাশনাল নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া মেডি গ্রাফিক, স্পেস মেড এন্টারপ্রাইজ, প্রবর্তন সিস্টেমস লিমিটেড ও মেরিল লাইফ সায়েন্স নামে আরও চারটি প্রতিষ্ঠান তিনি বেনামে পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ পার্কভিউ হাসপাতাল, সিএসসিআর হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক লিমিটেড, চট্টগ্রাম মেডিকেল সেন্টার, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল এবং অ্যাপোলো ইমপেরিয়ালে চিকিৎসা-সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে মাসুদ এই ব্যবসা চালিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিটি হার্টের রিংয়ে চিকিৎসকদের ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা কমিশন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে গত ছয় মাসে এসব হাসপাতালে ব্যবহৃত হৃদরোগ চিকিৎসা সরঞ্জামের মধ্যে অবৈধভাবে আনা পণ্যের প্রমাণ পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, কাগজে-কলমে সচল থাকলেও বাস্তবে ভার্টেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের কোনো অফিস নেই বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
মাসুদুর রহমান অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দায় নিতে চাননি। তিনি বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানের ঔষধ প্রশাসনের নিবন্ধন নেই। আমি দ্য স্পন্দন লিমিটেডের সাব-ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করছি।
অবৈধ সরঞ্জাম এসে থাকলে তা দ্য স্পন্দন লিমিটেড আনতে পারে, আমি শুধু হাসপাতালে মালপত্র সরবরাহ করি।
অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরবরাহ করা হৃদরোগের সরঞ্জাম কীভাবে দেশে এসেছে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি বলেন, আমার নামে প্রতিষ্ঠান থাকার নথি দেখান, তার পর মন্তব্য করব। নথি দেখানোর পর তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দ্য স্পন্দন লিমিটেডের পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত হৃদরোগ সরঞ্জাম অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্যাডে হাসপাতালে সরবরাহের সুযোগ নেই।
তাঁর ভাষ্য, হাসপাতালগুলো কেন অন্য কারও কাছ থেকে এসব সরঞ্জাম নিয়েছে, সে তথ্য তিনি চাইবেন।
মাহফুজুর রহমান বলেন, এগুলো ভারত থেকে অবৈধভাবে আনা হতে পারে। মাসুদ শুধু আমাদের একজন সাব-ডিস্ট্রিবিউটর, এর বাইরে তাঁর অন্য কোনো ব্যবসা থাকতে পারে, যা আমার জানা নেই।
২০২৩ সালে নিম্নমানের উপকরণ রাখার কারণে তাঁদের প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা শুধু ব্যবসা করি, এর বাইরে কিছু জানি না।
চমেকের ক্যাথল্যাবে অবৈধ রিং ব্যবহারের অভিযোগ
অনুসন্ধানে শুধু মাসুদুর রহমানের নাম নয়, হৃদরোগ চিকিৎসা সরঞ্জামের এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে চমেক হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহীম চৌধুরীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
চমেক হাসপাতালের ক্যাথল্যাবে অবৈধ হার্টের রিং ও সরঞ্জাম ব্যবহারের দালিলিক তথ্য পাওয়া গেছে বলেও অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ডা. ইব্রাহীম চৌধুরীর ভাতিজা ফায়েজ চৌধুরীর নামে কার্ডিওকিট নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে এই ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে।
কার্ডিওকিটের মাধ্যমে মূলত মাসুদুর রহমানের আনা অবৈধ হৃদরোগ চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ।
ফায়েজ চৌধুরী ব্যবসাটির সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, তিনি রিদম মেডিকেল ইন্টারন্যাশনাল থেকে হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত বেলুন ক্যাথেটার ও গাইড ওয়্যার নেন।
চমেক হাসপাতালে বোস্টন সায়েন্টিফিকের হৃদরোগের সরঞ্জামও রিদম মেডিকেল থেকে নেওয়া হয় বলে তিনি জানান।
তবে বৈধভাবে এসব সরঞ্জাম আমদানি বা সরবরাহের কোনো সুযোগ রিদম মেডিকেলের নেই বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
নিবন্ধনহীন প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা সরঞ্জাম কেন ব্যবহার করা হয়-এ প্রশ্নে ডা. ইব্রাহীম চৌধুরী বলেন, ‘আমার জানামতে নিবন্ধন ছাড়া কোনো কিছু ওয়ার্ডে ব্যবহার করা হয় না।
নথিপত্র দেখানোর পর অবশ্য তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি।
মাসুদকে চেনেন-এ কথা স্বীকার করে চমেক হৃদরোগ বিভাগের প্রধান বলেন, মাসুদ দীর্ঘদিন ধরে হার্টের রিং সরবরাহ করছেন। তাই সব চিকিৎসকের সঙ্গেই তাঁর পরিচয় আছে। তাঁর অনেক প্রতিষ্ঠান আছে বলেও তিনি জানান।
পার্কভিউতেও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
চমেক হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইকবাল মাহমুদের বিরুদ্ধে মেডি সায়েন্স টেকনোলজি নামে একটি বেনামি কোম্পানি খুলে পার্কভিউ হাসপাতালে ভারত থেকে অবৈধভাবে আনা হার্টের রিং ও সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে গত ছয় মাসে পার্কভিউ হাসপাতালে ব্যবহৃত হার্টের রিংয়ের কোনো ভ্যাট বা কর পরিশোধের কাগজ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
মেডি সায়েন্স টেকনোলজি মূলত সার্জিক্যাল সরঞ্জাম ও ওষুধের ব্যবসা করে।
করোনারি ডিভাইস বা হার্টের রিং বিক্রির কোনো লাইসেন্স বা অনুমোদন তাদের নেই বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে পার্কভিউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারেনি।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক মামুন কবীর ভূঁইয়া বলেন, আমি মেডিকেল যন্ত্রপাতির ব্যবসা করি। কিছু হৃদরোগ উপকরণের ব্যবসাও করতাম। তবে লাইসেন্স না থাকায় প্রশাসন ঝামেলা শুরু করলে সেই ব্যবসা থেকে সরে এসেছি।
নিজের নামে কোম্পানি খোলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডা. ইকবাল মাহমুদ। তাঁর দাবি, পার্কভিউ হাসপাতাল সব সময় মানসম্মত রিং কেনে। সূত্র-সমকাল
তাঁর ভাষ্য, যেসব পেসমেকার লাগানো হয়, সেখানে প্রোগ্রামার হিসেবে মাসুদের লোকজন থাকেন, কারণ তাঁরা এ কাজে অভিজ্ঞ।
ডা. ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমি ডাক্তার, কিন্তু এখানে পেসমেকার ইঞ্জিনিয়ারিংয়েরও একটা অংশ আছে। আমরা মূলত চারটি অনুমোদিত কোম্পানির রিং ব্যবহার করি।
মাসুদের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে বলে শুনেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক হাসপাতাল তাঁর কাছ থেকে সরঞ্জাম নেয়। তবে পার্কভিউ হাসপাতালে তাঁর রিং নেওয়া হয় না বলে দাবি করেন তিনি।
নার্সের নিয়ন্ত্রণে সরকারি হাসপাতালের ক্যাথল্যাব?
সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে চমেক হাসপাতালের ক্যাথল্যাব নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চমেক হাসপাতালে তিনটি ক্যাথল্যাব থাকলেও রহস্যজনক কারণে দুটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ক্যাথল্যাবটি মূলত সিনিয়র স্টাফ নার্স ও নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন আকন্দ এবং খোকন কান্তি বিশ্বাসের কাছে জিম্মি বলে অভিযোগ।
এই দুজনই কোন কোম্পানির পণ্য ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণ করে দেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতালে সার্ভিস চার্জ থাকলেও সরকারি এই হাসপাতালে তাঁরা ওটি চার্জ বাবদ ৫ হাজার টাকা করে নেন, যা দিতে প্রতিটি কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিকে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তিন বছরে পাঁচবার বিদেশ ভ্রমণের কথা স্বীকার করেছেন আনোয়ার হোসেন। তাঁর দাবি, নার্সিং পেশার বিভিন্ন প্রশিক্ষণসংক্রান্ত কাজে তিনি বিদেশে গেছেন।
ক্যাথল্যাব জিম্মি করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি কারও সঙ্গে খারাপ কিছু করেছি বা কাউকে কাজ করতে দিইনি-এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারলে আমি যে কোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব।
তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে চাকরি ছেড়ে দেব। স্টেন্ট তো নির্ধারণ করেন ডাক্তার ও রোগীর স্বজন।
আরেক সিনিয়র স্টাফ নার্স খোকন কান্তি বিশ্বাস এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতিটি স্টেন্ট ব্যবহারের বিপরীতে চিকিৎসকদের জন্য বড় অঙ্কের কমিশন নির্ধারিত থাকে। একেকটি স্টেন্টে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কিছু ইউরোপীয় বা কোরিয়ান ব্র্যান্ডের স্টেন্টে কমিশন বেশি হওয়ায় চিকিৎসকদের একটি অংশের আগ্রহ সেসব পণ্যে বেশি বলে অভিযোগ।
বিপরীতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কিছু ব্র্যান্ডের পণ্যে কমিশন তুলনামূলক কম হওয়ায় সেগুলোর ব্যবহার কম হয় বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে-রোগীর জন্য কোন স্টেন্টটি সবচেয়ে নিরাপদ ও উপযোগী, সেটি কি চিকিৎসাগত প্রয়োজনেই নির্ধারিত হচ্ছে, নাকি কমিশনের অঙ্কও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে?
চমেকের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আনিসুল আউয়াল বলেন, হার্টের রিংয়ের সরবরাহ তাঁরা মেইনটেইন করেন না। এসব বিষয় টেকনিশিয়ানরা দেখেন।
তাঁর মতে, নামি কোম্পানির আড়ালে কেউ অনুমোদনহীন কম দামি স্টেন্ট ঢুকিয়ে দিলে এমন সমস্যা হতে পারে।
ডা. আশীষ দে বলেন, অনেক সময় এক কোম্পানির সঙ্গে অন্য কোম্পানির ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে চিকিৎসকদের নাম জড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি মাসুদকে চেনেন এবং তাঁর কোম্পানিগুলো সরকার অনুমোদিত বলে জানেন।
হৃদরোগ বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক সাইফুদ্দিন সোহাগ বলেন, এসব বিষয় তদারক করার জন্য বিভাগীয় প্রধান ইব্রাহীম চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাঁর নাম থাকার বিষয়েও তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
সহযোগী অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম আল মামুন বলেন, রোগীর স্বজনেরা তাঁদের বাজেট অনুযায়ী স্টেন্ট পছন্দ করেন, আর চিকিৎসকেরা শুধু পরামর্শ দেন। তাঁর দাবি, তাঁরা সব সময় মানসম্মত স্টেন্ট ব্যবহারের চেষ্টা করেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য না পাওয়ায় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আসা অন্তত ১০ চিকিৎসকের নাম আপাতত প্রকাশ করা হয়নি।
রোগী জানেন না, তাঁর হৃদয়ে কী বসানো হলো
এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি উঠে এসেছে রোগীর অধিকার ও তথ্য জানার প্রশ্নে।
নিয়ম অনুযায়ী, রোগীকে জানাতে হয় তাঁকে কী ধরনের বা কী মানের স্টেন্ট দেওয়া হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর পণ্যের প্যাকেট ও বিস্তারিত তথ্যও রোগীর স্বজনদের দেওয়ার কথা।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই অপারেশনের পর রোগী বা তাঁর স্বজনদের এসব তথ্য দেওয়া হয় না। পণ্যের প্যাকেটও তাঁদের হাতে পৌঁছায় না।
ফলে যে মানুষটি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হৃদরোগের চিকিৎসা নিচ্ছেন, তিনি শেষ পর্যন্ত জানতেই পারছেন না, তাঁর শরীরে কী বসানো হলো-সেটি কোন কোম্পানির, কোথা থেকে এসেছে কিংবা সেটির বৈধতা কী। এমন ৫০ রোগীর তথ্য অনুসন্ধানে এসেছে।
চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে এই তথ্য গোপনীয়তা শুধু ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন নয়, এটি রোগীর নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
কোনো পণ্যের উৎস, মান, আমদানি ও সংরক্ষণব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য না থাকলে পরবর্তী সময়ে জটিলতা দেখা দিলে দায় নির্ধারণও কঠিন হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম কি এখন অবৈধ বাণিজ্যের নতুন কেন্দ্র?
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঢাকায় প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ায় চক্রটি এখন চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম বিস্তারের চেষ্টা করছে।
এই অভিযোগ সত্য হলে তা আরও উদ্বেগজনক। কারণ একটি শহরের হাসপাতালভিত্তিক সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও।
হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট ও অন্যান্য ডিভাইস কোনো সাধারণ পণ্য নয়। এগুলো সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
তাই এসব পণ্যের আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, সরবরাহ ও ব্যবহারের প্রতিটি ধাপ কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকা জরুরি।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিটি মেডিকেল ডিভাইস নির্দিষ্ট তাপমাত্রা মেনে সংরক্ষণ ও পরিবহন করতে হয়।
অবৈধ পথে দেশে আসা পণ্যের ক্ষেত্রে এই কোল্ড চেইন বজায় থাকে না। ফলে ডিভাইসের কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাঁর মতে, এতে রোগীরা প্রতারিত ও ঝুঁকিতে পড়ছেন, পাশাপাশি সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। সংকট নিরসনে এসব পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তদন্তের অপেক্ষায় গুরুতর অভিযোগগুলো
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহা. আলমগীর হোসেন স্বীকার করেছেন, হার্টের রিং অবৈধ পথে দেশে আসছে-এমন তথ্য তাঁদের কাছে রয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু অসাধু চিকিৎসক ও ব্যক্তি এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। নিবন্ধন ছাড়া কোনো মেডিকেল ডিভাইস আমদানি বা ব্যবহারের সুযোগ নেই।
অভিযোগের সত্যতা ও যথাযথ প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুধু অভিযোগের কথা জানা পর্যন্তই কি বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই শুরু হবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত?
এই অনুসন্ধানে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আমদানির নথি, ঔষধ প্রশাসনের নিবন্ধন, কাস্টমসের তথ্য, ভ্যাট-কর পরিশোধের কাগজ, হাসপাতালের ক্রয়াদেশ, সরবরাহ চালান, ক্যাথল্যাবের ব্যবহার-রেকর্ড এবং রোগীদের দেওয়া স্টেন্টের প্যাকেট-সবকিছু একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ প্রশ্নটি শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নিয়ে নয়। প্রশ্নটি একজন রোগীর হৃদয়ে বসানো স্টেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে। প্রশ্নটি চিকিৎসা ব্যবস্থায় কমিশনের প্রভাব নিয়ে।
প্রশ্নটি সরকারি হাসপাতালের ক্যাথল্যাব কে নিয়ন্ত্রণ করে, তা নিয়ে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-মানুষ যখন জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তাঁর অজান্তে সেই চিকিৎসার ভেতরেই যদি ঢুকে পড়ে অবৈধ বাণিজ্য, তবে তার দায় নেবে কে?
হৃদয়ের ভেতর বসানো একটি স্টেন্টের মান নিয়ে সামান্য সন্দেহও যেখানে একজন মানুষের জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে, সেখানে এই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত এখন আর কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়-এটি জনস্বার্থের জরুরি দাবি।




