গুরুপূর্ণিমার পবিত্র তিথিতে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার অনন্য প্রকাশ ঘটল চট্টগ্রামের থিয়েটার ইনস্টিটিউটে।
গুরু পূর্ণিমা উদযাপন পরিষদ ২০২৬-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘গুরু প্রণাম’ শীর্ষক এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বরেণ্য তবলাশিল্পী ও গুরু শ্রী সুদীপ সেনগুপ্তের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান সুর, তাল, লয়, সাধনা ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনমেলায় পরিণত হয়।
গুরুর চরণেই জ্ঞানের সূচনা, আর গুরুর আশীর্বাদেই শিল্পের পূর্ণতা-যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই চিরন্তন বিশ্বাসকে হৃদয়ে ধারণ করেই আয়োজন করা হয় ‘গুরু প্রণাম’।
গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক যে কেবল শিক্ষা ও অনুশীলনের নয়, বরং আত্মার এক গভীর বন্ধন-অনুষ্ঠানের প্রতিটি পরিবেশনায় যেন তারই প্রতিফলন ঘটেছে।
সুর, তাল, লয় ও আবেগের সম্মিলনে সন্ধ্যাটি রূপ নেয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক মহোৎসবে। প্রতিটি পরিবেশনা হয়ে ওঠে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধার একেকটি পুষ্পাঞ্জলি।
মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলন ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়।
গুরুপূর্ণিমার পবিত্র আবহে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এ পর্বে অতিথি, শিল্পী ও দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে থিয়েটার ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন ও আন্তরিক পরিবেশ।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বক্তব্য রাখেন তবলা গুরু সুদীপ সেনগুপ্ত। তিনি সকল গুরুজনকে সশ্রদ্ধ প্রণতি জানিয়ে বলেন, জীবনে গুরুর স্থান সর্বোচ্চ। গুরুর কাছ থেকেই মানুষ জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার শিক্ষা লাভ করে।
ভালো-মন্দ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে শেখে তাঁরই সান্নিধ্যে। জীবনের অন্ধকার পথকে যিনি জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেন, তিনিই প্রকৃত গুরু।
তিনি আরও বলেন, পবিত্র গুরুপূর্ণিমার এই মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি বিশ্বাস করেন-যেসব শিক্ষার্থী গুরুর আদর্শ, শৃঙ্খলা ও সত্যকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে, তাদের সাফল্য অনিবার্য।
তাঁদের জীবন যেন জ্ঞান, নৈতিকতা, সত্য, মানবিকতা ও শক্তির দীপ্তিতে আলোকিত হয়।
গুরুজনদের আশীর্বাদে তাঁরা যেন দেশ, সমাজ ও সংস্কৃতির কল্যাণে নিজেদের নিবেদিত করতে পারে এ প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, গুরু কেবল একজন শিক্ষক নন, তিনি একজন মানুষের জীবন গঠনের স্থপতি। তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও প্রেরণাই একজন শিষ্যকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয়।
পন্ডিত সুদীপ সেনগুপ্ত দীর্ঘদিনের তবলা সাধনার মধ্য দিয়ে শুধু একজন গুণী শিল্পী হিসেবেই নয়, একজন নিবেদিতপ্রাণ গুরুর পরিচয়ও তুলে ধরেছেন।
তাঁর সুরসাধনা এবং শিষ্য গড়ে তোলার নিরলস প্রচেষ্টা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।
বক্তারা আরও বলেন, ‘গুরু প্রণাম’ নিছক একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি গুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক মহৎ উদ্যোগ।
এ ধরনের আয়োজন আগামী প্রজন্মকে সংস্কৃতি, শৃঙ্খলা ও গুরুভক্তির চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি গুরু-শিষ্যের চিরন্তন সম্পর্কের মূল্যবোধকে আরও গভীরভাবে ধারণ করতে অনুপ্রাণিত করবে।
এরপর রেওয়াজের শিষ্যবৃন্দ পরিবেশন করেন হৃদয়স্পর্শী ‘গুরুবন্দনা’।
তাঁদের পরিবেশনার সুরের আবেশে মিলনায়তন ভরে ওঠে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অনুরণনে। গুরুর প্রতি নিবেদিত এই পরিবেশনা উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
পরবর্তীতে প্রখ্যাত শিল্পী দোলন কানুনগো তাঁর মনোমুগ্ধকর মোহনবীণা বাদন পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। সুরের অনন্য মূর্ছনায় অনুষ্ঠানের আবহে যোগ হয় ভিন্নমাত্রা।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল রূপক তবলা ইনস্টিটিউশন-এর পরিবেশনায় ‘বৃন্দ তবলা লহরা’। এর পরিচালনায় ছিলেন আশীষ চৌধুরী।
পরিবেশনায় অংশ নেন প্রথম কুয়ার জৈন, রিপন দাশ, সৌমেন দাশ ও শেখ আরমানুল ইসলাম আদর।
তাঁদের নিখুঁত তাল-লয় ও সমন্বিত পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। করতালিতে বারবার মুখরিত হয়ে ওঠে মিলনায়তন।
এরপর রিটন কুমার ধর পরিবেশন করেন হৃদয়ছোঁয়া কণ্ঠসংগীত। মনোমুগ্ধকর বেহালা বাদন পরিবেশন করেন অপরাজিতা চৌধুরী।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পরিবেশনায় তবলা সংগতে ছিলেন রোমেন বিশ্বাস (রাজু), জুয়েল চৌধুরী, সুশান্ত কর চৌধুরী, সানি দে, দেবাশীষ দাশ ও তিষাণ ঘোষ। হারমোনিয়ামে সহযোগিতা করেন সৈকত দত্ত ও অভিষেক নন্দী এবং তানপুরায় ছিলেন নয়ন চক্রবর্তী।
প্রখ্যাত বাচিক শিল্পী প্রবীর পাল-এর প্রাঞ্জল ও নান্দনিক উপস্থাপনা পুরো অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য করে তোলে। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনায় একের পর এক পরিবেশনা দর্শক-শ্রোতাদের কাছে হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়।
অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন আহ্বায়ক বুলান দত্ত এবং সদস্য সচিব সানি দে।
তাঁদের আন্তরিক পরিকল্পনা, নিরলস পরিশ্রম এবং শিল্পীদের আন্তরিক অংশগ্রহণে ‘গুরু প্রণাম’ হয়ে ওঠে গুরু-শিষ্য সম্পর্ক, সুরসাধনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনবদ্য উৎসব।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গুণীজনের উপস্থিতি আয়োজনটিকে করে তোলে আরও বর্ণিল ও প্রাণবন্ত। তাঁদের উপস্থিতিতে পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে তৈরি হয় শিল্প ও সংস্কৃতির এক উষ্ণ, আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আবহ।




