ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চিকিৎসাসেবার চেষ্টা

পরিবেশ দূষণ ও নকশা জালিয়াতি: উদ্বোধনের আগেই থমকে গেল ‘এরিস্টোকেয়ার’

হাসপাতালে কার ইশারায় বেপরোয়া অনিয়ম?

অনলাইন ডেস্ক

চট্টগ্রামের মেহেদীবাগে এরিস্টোকেয়ার হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভবন নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠেছে।

- Advertisement -

অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের অমিল, পার্কিং সুবিধার ঘাটতি, হাসপাতাল হিসেবে ভবনটির নিরাপত্তা, আদালতের নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অবস্থানগত ছাড়পত্র ছাড়াই চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি সামনে এসেছে।

- Advertisement -
google news follower

এসব অভিযোগের মধ্যে সিডিএর অভিযানে ভবনটির নকশায় অসঙ্গতি পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

আপাতত হাসপাতালটির সব কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

- Advertisement -
islamibank

অন্যদিকে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আরোপ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বেলা ১২টা থেকে নগরের মেহেদীবাগ রোডে এরিস্টোকেয়ার হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতালে অভিযান চালায় সিডিএ।

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে প্রধান প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সিডিএর অভিযানে এরিস্টোকেয়ার হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ১০ তলা ভবনের অনুমোদিত নকশা নিয়ে গুরুতর কিছু অসঙ্গতির তথ্য সামনে আসে।

তথ্যসূত্র অনুযায়ী, নকশায় ভবনটিতে ১৯টি পিলার নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে নির্মাণ করা হয়েছে ১৭টি। শুধু তা-ই নয়, অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত একটি লিফট নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে।

অর্থাৎ, কাগজে যে ভবনের কাঠামোগত পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছিল, বাস্তব নির্মাণ তার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ-সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। বিশেষ করে ভবনটি হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় কাঠামোগত নিরাপত্তা ও রোগীদের ঝুঁকির বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

আদালতের নির্দেশের পরও নির্মাণকাজ চলেছিল?

এরিস্টোকেয়ার হাসপাতাল ভবন নিয়েও আদালতে অভিযোগ গড়ানোর তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা শহীদ উল্লাহ ভবনটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ এনে উচ্চ আদালতে আবেদন করেন।

২০২৫ সালের ৪ জুন তিনি স্টে অর্ডার চেয়ে আবেদন করেন। একই বছরের ২৪ জুন ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন আদালত।

তবে অভিযোগ রয়েছে, আদালতের ওই নির্দেশ উপেক্ষা করেই ভবনটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

এই অভিযোগের সত্যতা ও আদালতের আদেশ বাস্তবে কীভাবে প্রতিপালিত হয়েছিল, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কারণ নির্মাণাধীন কোনো ভবনের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় কাজ চলেছে কি না-তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয় নয়, আদালতের আদেশ পালনের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।

অভিযান শেষে সিডিএর চিফ ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল বলেছিলেন, আমরা বেশকিছু অসঙ্গতি পেয়েছি। আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসব। এরপর সিদ্ধান্ত নেব। আপাতত সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, এরিস্টোকেয়ার হাসপাতালের ভবনটি ফ্ল্যাট নির্মাণের অনুমোদন নিয়ে তৈরি হলেও বর্তমানে সেখানে হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে। ভবনের নকশায় কিছু ত্রুটি রয়েছে বলেও প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন।

বেলায়েত হোসেন বলেন, ভবনটি হাসপাতাল হিসেবে নিরাপদ কি না, তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অনুমতি দেওয়া হলে নির্দিষ্ট শর্ত মেনেই হাসপাতাল পরিচালনা করতে হবে।

এর মধ্যে পার্কিং, অগ্নিনিরাপত্তা, ভূমিকম্প-সহনশীলতা এবং প্রয়োজনীয় সব সনদ নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে, যাতে রোগীদের কোনো অসুবিধা না হয়।

পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই চিকিৎসা কার্যক্রমের অভিযোগ

সিডিএর অভিযানের মধ্যেই এরিস্টোকেয়ার হাসপাতাল নিয়ে পরিবেশগত অনিয়মের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অমান্য করে কোনো ধরনের অনুমোদন না নিয়েই নগরের চকবাজার এলাকার মেহেদীবাগ রোডে হাসপাতালটি চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করে।

অবস্থানগত ছাড়পত্র ছাড়া হাসপাতাল পরিচালনার অভিযোগে বেসরকারি এরিস্টোকেয়ার হাসপাতালকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আরোপ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

গতকাল পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ে আয়োজিত শুনানি শেষে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, অবস্থানগত ছাড়পত্র না নিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের আওতায় পড়ে।

একই সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনতিবিলম্বে তরল বর্জ্যের যথাযথ ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শুধু জরিমানা করেই বিষয়টি শেষ করেনি পরিবেশ অধিদপ্তর। তরল বর্জ্য পরিশোধনের সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণের পরই হাসপাতালটির কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে বলে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছে।

পরিদর্শনে অনিয়ম, শুনানিতে স্বীকারোক্তি

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান জানান, গত ২৯ জুলাই পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি দল হাসপাতালটি পরিদর্শন করে বিভিন্ন অনিয়ম পায়।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল পরিচালনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো অবস্থানগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।

এ অভিযোগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে শুনানিতে ডাকা হয়। সেখানে অনিয়মের বিষয়টি তারা স্বীকার করলে আইন অনুযায়ী দেড় লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হয় বলে জানান মুক্তাদির হাসান।

তিনি আরও জানান, পরিবেশ দূষণ রোধ এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া অবৈধভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান ও আইনগত ব্যবস্থা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

সিডিএ জানিয়েছে, প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ভবনটি হাসপাতাল হিসেবে নিরাপদ কি না যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর পরিবেশ অধিদপ্তরও জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত শর্ত পূরণ না করে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।

এখন নজর থাকবে সিডিএর প্রকৌশলগত যাচাই, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের বিষয়টি এবং পরিবেশগত শর্ত পূরণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়-তার ওপর। 

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ