ঝকঝকে কাচের দেওয়াল, ভেতরে সাজানো রকমারি পণ্যের সামারোহ-প্রথম দর্শনে চট্টগ্রাম নগরীর ‘উৎসব সুপার মার্কেট’ বা ‘উৎসব সুপার শপ’কে অভিজাত ও পরিচ্ছন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
কিন্তু এই চটকদার আলোর আড়ালেই গড়ে উঠেছে অনিয়ম, ভোক্তা প্রতারণা, বাণিজ্যিক জালিয়াতি এবং কর্মস্থলে নিরাপত্তার চরম ঘাটতির এক বিশাল জাল।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ভুক্তভোগীদের পৃথক একাধিক সুনির্দিষ্ট চাঞ্চল্যকর তথ্যে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক ভয়ংকর অপরাধের কথা।
নকশা জালিয়াতি ও অবৈধ পার্কিং বাণিজ্য
নগরীর হালিশহর এক্সেস রোডে অবস্থিত উৎসব সুপার মার্কেটের আউটলেটটিতে বাণিজ্যিক ভবনের জন্য অনুমোদিত নকশার তোয়াক্কাই করা হয়নি।
নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ এবং পার্কিং ব্যবস্থা না রেখে উল্টো রাস্তার জায়গা দখল করে গাড়ি পার্কিং করছিল প্রতিষ্ঠানটি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনের নেতৃত্বে এবং স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট হামীমুন তানজীনের পরিচালনায় সেখানে এক ঝটিকা অভিযান চালানো হয়।
পরিদর্শনের সময় সিডিএ কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদিত নকশা দেখাতে ব্যর্থ হয় মার্কেট কর্তৃপক্ষ।
এসব অনিয়মের দায়ে সিডিএর ম্যাজিস্ট্রেট হামীমুন তানজীন ৮ লাখ টাকা জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে দুই বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন।
একইসঙ্গে আগামী ২৭ নভেম্বরের মধ্যে নকশার ব্যত্যয়কৃত অংশ সংশোধন ও প্রয়োজনীয় পার্কিং নিশ্চিতের জন্য মুচলেকা নেওয়া হয়।
অভিযানে সিডিএর অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পচা খাদ্য ও নকল লেবেলিংয়ে ‘বিষ’ বিক্রির মহোৎসব
ভবন জালিয়াতির খবর পুরোনো হতে না হতেই সামনে আসে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চালানো আরেক ভয়ংকর অভিযানের তথ্য।
গত শনিবার (২২ আগস্ট) চট্টগ্রাম নগরীর বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের ১ম শ্রেণির মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তফার নেতৃত্বে চালানো অভিযানে উৎসব সুপার শপের আসল রূপ উন্মোচিত হয়।
বাইরে থেকে চকচকে হলেও ভেতরের চিত্র ছিল স্রেফ জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক আঘাত:
নষ্ট খাদ্য বিক্রি: আমদানিকৃত পণ্যের গায়ে আসল পুষ্টিতথ্য গোপন করে নিজস্ব স্টিকার বসানো, পচা মরিচ, নষ্ট মসলা, মেয়াদোত্তীর্ণ মোমোস ও মেয়াদহীন চকলেট বিক্রি।
বিপজ্জনক প্রক্রিয়াজাতকরণ: কোল্ড স্টোরেজ সঠিকভাবে পরিচালনা না করা, জিলাপিতে ব্যবহৃত ভেজাল রঙের তথ্য গোপন এবং একই অননুমোদিত সরঞ্জামে গরু ও খাসির মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ।
অনুমোদনহীন পণ্য: সরকারের যথাযথ নিবন্ধন ও আমদানিকারকের তথ্য ছাড়াই শিশুখাদ্য, ফুড সাপ্লিমেন্ট এবং অনিরাপদ ঘরোয়া আচার বিক্রি।
এসব অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি আদালত অননুমোদিত আচার ও হোমমেইড পণ্য বিক্রি অবিলম্বে বন্ধ এবং ফলমূল বিক্রির প্রকৃত তথ্য পেশের কঠোর নির্দেশ দেন।
প্রভাবশালীদের ছায়ায় অর্থ আত্মসাৎ ও হুমকি
প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও পণ্যের বাইরে অভ্যন্তরীণ মালিকানা কাঠামাতেও রয়েছে চরম প্রতারণা ও দুর্নীতির ছাপ।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ছাদেক আলীর লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুচ সালামের ভাগিনা ও আত্মীয় পরিচয়ের প্রভাব খটিয়ে গড়ে তোলা হয় এই নেটওয়ার্ক।
খুলশীর মতো আবাসিক এলাকায় যথাযথ নকশা অনুমোদন ছাড়া সুপার মার্কেট চালুর পরিকল্পনা এবং পরিচালন সংক্রান্ত দায়িত্বের বিনিময়ে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ছাদেক আলীর কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ নেওয়া হয়।
চুক্তি ছিল ৫ শতাংশ লভ্যাংশ পাওয়ার। কিন্তু ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কেট চালুর পর তাকে মূল চুক্তির কপি দেওয়া হয়নি, অডিট হিসাবও গোপন করা হয়।
পরবর্তীতে লভ্যাংশ কমানো এবং বিনিয়োগকৃত টাকা ফেরত চাইলে সাবেক ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে ছাদেক আলীকে প্রাণনাশের ও বড় ধরনের ক্ষতির হুমকি দেওয়া হতে থাকে।
এমনকি অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার মো. জহির ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এক মনগড়া হিসাবে তার মূলধনের চেয়ে কম টাকা প্রাপ্য দেখিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
কর্মস্থলে নারী সহকর্মীদের ওপর যৌন হয়রানির ছায়া
উৎসব সুপার শপের ভেতরকার পরিবেশ কতটা অস্বাস্থ্যকর, তা ফুটে উঠেছে এর সাবেক কর্মচারী মোহাম্মদ রাসেলের সামাজিক মাধ্যম ও ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে করা এক খোলা চিঠিতে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানটির আলমগীর জয় নামের এক ইনচার্জ নারী কর্মচারীদের ওপর চাকরিচ্যুত করার মানসিক চাপ সৃষ্টি করে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন প্রস্তাব দিয়ে আসছেন।
চাকরি হারানোর ভয়ে অনেক নারী কর্মী নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। কর্মস্থলে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ঘটনাটি গোপনে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য শপের উচ্চপদস্থ ম্যানেজমেন্টের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন সাবেক এই কর্মী।
উদ্বেগ ও জরুরি তদন্তের দাবি
একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নকশা জালিয়াতি, বিষাক্ত ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রি, বিনিয়োগকারীর টাকা আত্মসাৎ এবং কর্মস্থলে নারী হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগগুলো স্পষ্ট করে যে, উৎসব সুপার মার্কেট আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কোনো তোয়াক্কাই করছে না।
অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলো সমন্বিত তদন্ত শুরু না করলে নগরবাসীর সুরক্ষার বিষয়টি আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।




