সামাজিক বনায়নের নিলাম ডেকে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব গায়েব, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং পরবর্তীতে ভিন্ন রেঞ্জের সিল-স্বাক্ষর ব্যবহার করে জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের হাটহাজারী রেঞ্জের সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমানে সদর রেঞ্জে কর্মরত মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট নথি ও স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠেছে চরম আর্থিক অনিয়ম ও সাধারণ সুবিধাভোগীদের জিম্মি করার ভয়াবহ অভিযোগ।
অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির চিত্র
২০১১-১২ অর্থবছরে হাটহাজারী সদর বিটে ২০ হেক্টর ও ৩৩ হেক্টর জমিতে স্থাপিত সামাজিক বনায়নের দুটি বাগানের মোট ১২টি লট ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিলামে বিক্রি হয়।
নিয়ম অনুযায়ী বিক্রয়লব্ধ মোট ২ কোটি ৭ লাখ টাকা অনতিবিলম্বে সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সম্পূর্ণ অর্থ আত্মসাৎ করেন।
বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে আনেন হাটহাজারী রেঞ্জের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি রেঞ্জার আইয়ুব আলী।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বরাবর প্রদত্ত লিখিত আবেদনের পর তড়িঘড়ি করে গত ১৩ আগস্ট কয়েক দফায় মাত্র ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জমা করা ওই চালানের কপিতে হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তার পরিবর্তে ‘শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা’র সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে-যা সরাসরি অর্থ তছরুপ ঢাকতে প্রশাসনিক জালিয়াতির স্পষ্ট আলামত।
| পর্যালোচনার বিষয় | বিবরণ ও পরিসংখ্যান |
| মোট বাগানের আয়তন | ২০ হেক্টর এবং ৩৩ হেক্টর (দুটি বাগান) |
| নিলামকৃত লট সংখ্যা | ১২টি লট (২০২২-২৩ অর্থবছর) |
| মোট বিক্রয়মূল্য | ২০ হেক্টরে ৭৫ লাখ + ৩৩ হেক্টরে ১ কোটি ৩২ লাখ = ২ কোটি ৭ লাখ টাকা |
| ৩ বছর পর জমা প্রদর্শিত | ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫০ টাকা (সন্দেহজনক চালানে) |
| অসংগতি ও তছরুপ | প্রায় ১ কোটি ৯৩ লাখ ৩২ হাজার টাকা গায়েব |
সংখ্যালঘু পরিবার ও সাধারণ উপকারভোগীদের চরম নিরাপত্তাহীনতা
সামাজিক বনায়নের মূল লক্ষ্য স্থানীয় দরিদ্র ও বিশেষ করে অনগ্রসর সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন।
তবে মো. সাইফুল ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য ও চরম দখলদারিত্ব মনোভাবের কারণে উল্টো নিঃস্ব হয়ে পড়েছে স্থানীয় সুবিধাভোগী পরিবারগুলো।
গাছ কাটা ও পরিবহন সম্পন্ন হলেও তারা পাননি লভ্যাংশের বকেয়া টাকা। সুবিধাভোগী পরিবারের সদস্যরা বকেয়া পাওনা চাইতে গেলে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তা তাদের ওপর চড়াও হন এবং ভয়ভীতি দেখান বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্বল ও সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর ওপর অব্যাহত চাপ সৃষ্টি করার কারণে বর্তমানে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।
প্রশাসনিক নীরবতা ও জরুরি পদক্ষেপের দাবি
বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধানে গেলে অভিযুক্ত মো. সাইফুল ইসলাম বিভিন্ন গণমাধ্যমকে কয়েকটি অস্পষ্ট চালান দেখালেও নিলামের কোনো মূল কার্যাদেশ বা ব্যাংক জমা সংক্রান্ত বৈধ নথি প্রদর্শন করতে পারেননি।
অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা, বর্তমানে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সদর রেঞ্জের দায়িত্বে থাকা মো. সাইফুল ইসলামের অফিসিয়াল মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালে তিনি সেখানে উল্লেখ করেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, মনগড়া ও বানোয়াট। একটি স্বার্থন্বেষী মহল আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করা ও মান-সম্মান হানির নিমিত্তে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও মনগড়া তথ্য গণমাধ্যমকে দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যদি কেহ প্রমান দিতে পারে আমি সরকারের একটি টাকাও রাজস্ব আত্মসাৎ করেছি তাহলে আমি স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিব।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে-এর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিনীত আকুতি-প্রভাবশালী এই কর্মকর্তার প্রশাসনিক জালিয়াতি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্ত কমিটি গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক, যাতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের ন্যায্য পাওনা ফেরত পায় এবং এলাকায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।




