এক বাড়িতে ৬৩ বিদেশি নাগরিক কেন, কী বলছে পুলিশ

অনলাইন ডেস্ক

একটি বাড়িতে ৬৩ বিদেশি নাগরিক। কারও হাতে মোবাইল, কেউ ব্যস্ত ল্যাপটপে। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ আবাসিক বাড়ি মনে হলেও ভেতরে চলছিল সংঘবদ্ধ অনলাইন কার্যক্রম। চট্টগ্রাম নগরীর খুলশীর কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ওই বাড়িতে প্রায় দেড় মাস ধরে অবস্থান করছিলেন চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের নাগরিকরা। পুলিশের অভিযানে একসঙ্গে ৬৩ জন গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য।

- Advertisement -

বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন এক দুবাইপ্রবাসীর কাছ থেকে। সেখানে অবস্থান করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্‌ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা ও অন্যান্য অনলাইন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছিল। অভিযানে উদ্ধার হওয়া ডিভাইসের সংখ্যাও বেশ বড়— ১৩৪টি মোবাইল ফোন ও ৫৭টি ল্যাপটপ। এর সঙ্গে ছিল ট্যাব, পেনড্রাইভ, সিমকার্ডসহ অন্যান্য সরঞ্জাম।

- Advertisement -
google news follower

এখন প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক একসঙ্গে চট্টগ্রামে এসে কীভাবে একটি আবাসিক বাড়ি ভাড়া নিলেন এবং দেড় মাস ধরে সেখানে অবস্থান করলেন? তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বাড়ির মালিক, আশপাশের বাসিন্দা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা জানতেন? আসামিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোন দেশের নাগরিক ছিলেন, কে বা কারা বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন এবং ভাড়াটেদের পরিচয় যাচাই কীভাবে হয়েছিল— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনসের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহম্মদ জানান, খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে অভিযান চালায় সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা পুলিশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটির মালিক একজন দুবাইপ্রবাসী। প্রায় দেড় মাস আগে বাড়িটি ভাড়া নিয়ে সেখানে থাকতে শুরু করেন বিদেশি নাগরিকরা।

- Advertisement -
islamibank

অভিযানে উদ্ধার করা ডিভাইসের সংখ্যা থেকে বোঝা যায়, বাড়িটিতে অনলাইনভিত্তিক কাজের জন্য একটি সংগঠিত সেটআপ ছিল। ৬৩ জনের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ১৩৪টি মোবাইল ফোন। অর্থাৎ গড়ে প্রায় দুইটি করে মোবাইল ছিল প্রত্যেকের জন্য। এর পাশাপাশি পাওয়া গেছে ৫৭টি ল্যাপটপ।

এ ছাড়া একটি অ্যাপল ট্যাব, সিপিইউ, স্যামসাং মনিটর, কিবোর্ড, মাউস, প্রিন্টার ও পাঁচটি পেনড্রাইভ উদ্ধার করা হয়েছে। পাওয়া গেছে চারটি সিমকার্ড। পাকিস্তানের তিনটি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং কম্বোডিয়ার একটি কর্মসংস্থান কার্ডও উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, এতগুলো ডিভাইস কেন এবং কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল, এখন সেটিই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ডিভাইসগুলো পরীক্ষা করে অনলাইন যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন, ব্যবহৃত ওয়েবসাইট ও প্ল্যাটফর্‌ম এবং সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করবে তারা।

শুধু বিদেশিরা নন, আছে সহযোগীরাও

পুলিশ বলছে, এই চক্রের কার্যক্রম শুধু ওই বাড়ির ৬৩ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দেশীয় ও বিদেশি সহযোগীদের কথা জানিয়েছেন। তাদের কয়েকজন চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন বলে পুলিশকে তথ্য দিয়েছেন তারা।

এই সহযোগীরা কী ধরনের সহায়তা দিতেন, বাড়ি ভাড়া নেওয়া, যাতায়াত, যোগাযোগ, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সংগ্রহ কিংবা অর্থ লেনদেনে তাদের ভূমিকা ছিল কি না— এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাবে। কারণ, এতজন বিদেশি নাগরিকের জন্য বাসস্থান, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা এককভাবে পরিচালনা করা কঠিন।

চট্টগ্রাম কেন?

অনলাইন অপরাধের জন্য ভৌগোলিক অবস্থান অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ না হলেও চট্টগ্রাম বন্দরনগরী হওয়ায় এখানে দেশি-বিদেশি মানুষের চলাচল তুলনামূলক বেশি। বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আনাগোনাও রয়েছে। সেই সুযোগকে অপরাধী চক্র ব্যবহার করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের চট্টগ্রামে আসার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, তারা কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন কিংবা তাদের ভিসার ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

তদন্তে সামনে আসবে বড় নেটওয়ার্ক?

একটি বাড়ি থেকে ৬৩ বিদেশি নাগরিক এবং বিপুলসংখ্যক ডিভাইস উদ্ধারের ঘটনা, এটিকে নিছক একটি আবাসিক বাড়িতে কয়েকজন বিদেশির অবস্থানের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ রাখছে না। পুলিশের বক্তব্যে দেশি-বিদেশি সহযোগী এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের অবস্থানের তথ্যও এসেছে।

তদন্তে এখন মূল বিষয় হবে এই ৬৩ জনের মধ্যে কে কোন ভূমিকায় ছিলেন, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কারা যুক্ত ছিলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কী ধরনের কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছিল এবং এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না।

উদ্ধার করা মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের ফরেনসিক বিশ্লেষণেই এসব প্রশ্নের অনেক উত্তর মিলতে পারে। একই সঙ্গে ওই বাড়ির ভাড়া চুক্তি, বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে আসার নথি এবং তাদের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখলে চক্রটির বিস্তৃতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম বলেন, এ ঘটনায় খুলশী থানায় মামলা হচ্ছে। তদন্ত এগিয়ে গেলে চট্টগ্রামের ওই বাড়ি থেকে পরিচালিত অনলাইন কর্মকাণ্ডের ধরন এবং এর সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও তথ্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

জেএন/এমআর

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ