ডুবছে নগর: খালখেকোদের চেনে সবাই, উচ্ছেদ কবে?

0

বর্ষা আসলেই ডুববে চট্টগ্রাম, এটি যেন এখন এক অমোঘ সত্য। নগরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম খালগুলো অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়ার কারণেই কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় নগরের নিম্নাঞ্চল। জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প দিয়েও এ সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খালগুলোকে দখলমুক্ত না করা পর্যন্ত নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসন সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম শহরে মোট কয়টি খাল রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান কোথাও পাওয়া যায়নি। যদিও বিভিন্ন সময়ে নগর পরিকল্পনাবিদরা চট্টগ্রাম শহরে ১৪৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ১৭টি প্রধান খাল থাকার কথা বলে আসছেন। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্রতি বছর বর্ষাকে সামনে রেখে শহরের ১৭টি প্রধান খালসহ ছোট-বড় মোট ৩৪টি খাল থেকে মাটি ও ময়লা-আর্বজনা অপসারণ করে থাকে। এ হিসেবে এখনো ৩৪টি খাল রয়েছে, যেগুলো দৃশ্যমান। তবে এসব খালের প্রতিটিই হারিয়েছে তার প্রশস্ততা।

এসব খালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- চাক্তাই খাল, মির্জা খাল, রাজা খাল, চশমা খাল, নাছির খাল, বির্জা খাল, খন্দকিয়া খাল, কাজির খাল, গয়নাছড়া খাল, বামনশাহী খাল, কাট্টলী খাল, ত্রিপুরা খাল, ডোম খাল, শীতল ঝর্ণা ছড়া খাল, মায়া খাল, হিজড়া খাল, মহেশখাল, ডাইভারশন খাল, মরিয়ম বিবি খাল, সদরঘাট খাল, রামপুরা খাল, পাকিজা খাল, মোগলটুলী খাল উল্লেখযোগ্য।

তবে কাগজে-কলমে খালের সংখ্যা ৩৪টি হলেও নগরের প্রধান খাল ধরা হয় দুটিকে। বাকিগুলোকে এ দুটির শাখা খাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খালগুলো হল রাজাখালী খাল ও চাক্তাই খাল। নগরের বিদ্যমান জলাবদ্ধতা নিরসনের অনেকটাই নির্ভর করে এই দুই খালের ওপর। কিন্তু কর্ণফুলীর মতো দখল হয়ে গেছে এ দুই খালের অধিকাংশ জায়গা। দুটি খালের প্রায় দুই একর জায়গা দখল করে আছেন ১০২ জন দখলদার। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বাজার মূল্যে যা শত কোটি টাকার জায়গা।

জানা যায়, ২০১৫ সালে খাল দুটির অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। এরপর চার বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের উচ্ছেদে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। শিগগির দখলদারদের উচ্ছেদ করা না হলে চট্টগ্রামের মানচিত্র থেকে খালগুলো হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন জয়নিউজকে বলেন, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সেনাবাহিনী ও সিডিএ একসঙ্গে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তারা যখন কাজ করবে তখন অবশ্যই দখলদারদেরও উচ্ছেদ করবে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম নগরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম চাক্তাই খালের ১৯ হাজার ৯৮২ বর্গফুট জায়গা দখল করে আছেন ৪৮ দখলদার। চাক্তাই খালের ডান তীরে বাকলিয়া এলাকায় খালের ৩৭২ বর্গফুট জায়গা দখল করে দোকান গড়ে তুলেছেন আমির হোসেন, আবদুল বারেক, জসিম উদ্দিন, হাজি আমিনুল হক, হাজি রেজোয়ান ইসলাম, আহম্মদ হোসেন ও বাহাদুর। দুই হাজার বর্গফুট জায়গা অবৈধভাবে দখল করে ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন সাবেক কাউন্সিলর শহীদুল আলম, মো. ইউছুফ, মো. রফিক, শামসুল হক, বশির আহম্মদ, মো. ইউসুফ, আবদুছ ছালাম, নুরুল আমিন, জামাল আহাম্মদ, মাহবুব হোসেন, মো. নাছের ও মনির আহম্মদ।

এ ছাড়া আবাসন প্রতিষ্ঠান সিপিডিএল দখল করেছে ৮০ বর্গফুট।

চাক্তাই খালের ১ হাজার ৫৩০ বর্গফুট জায়গার উপর রয়েছে এনামুল হকের পাঁচতারা বাণিজ্যালয়, মোহাম্মদ আলমগীরের মাওলা স্টোর, জয়নাল আবেদীন আজাদের জেবি ট্রেডার্স, বাদল দেবের এ এম ট্রেডিং, দেব প্রসাদ চৌধুরীর মেসার্স সুভাষ স্টোর, আবদুল করিমের মামুন ব্রাদার্স, স্বপন বিশ্বাসের হাজি ছালাম অ্যান্ড সন্স, মঈনুল আলমের টিনের দোকান, মো. শাহজাহানের এস কে ট্রেডিং, আবু বক্কর চৌধুরী ও নীল কৃষ্ণা দাশ মজুমদারও গড়ে তুলেছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া কাঠ ও টিনের বেড়া দিয়ে খালের জায়গা দখলে রেখেছেন পাঁচ ব্যক্তি। মো. ইউছুফ ৮৫ বর্গফুট, ছালেহ আহম্মদ অ্যান্ড সন্স ৮৫ বর্গফুট, আবু মিয়া চৌধুরী ১০০ বর্গফুট, মো. মনির ১০০ বর্গফুট এবং আবু ছুফিয়ান ১২০ ফুট দখল করে রেখেছেন।

চাক্তাই খালের বাম তীরে দখলে রয়েছে প্রায় একহাজার ২৭৬ বর্গফুট জায়গা। এ স্থানের অবৈধ দখলদাররা হলেন- মাজহার আলী ইসলাম, মো. ইয়াকুব খান, স্বপন চৌধুরী, সিরাজ মিয়া, আবুল কালাম, নুর মোহাম্মদ, আলমগীর হোসেন ও আনোয়ার হোসেন। এখানে ২৮৬ বর্গফুট জায়গা দখল করে একতলা ভবন গড়ে তুলেছেন নূর মোহাম্মদ। ৫৮০ বর্গফুট জায়গার উপর আলমগীর হোসেনের একতলা ভবন ও ৫০ বর্গফুট জায়গার উপর আনোয়ার হোসেনের টিনশেড ঘর গড়ে উঠেছে।

এদিকে, ৫৪ জনের দখলে রয়েছে চট্টগ্রাম নগরের আরেকটি প্রধান খাল রাজাখালী খালের এক দশমিক ৩২ একর জায়গা। রাজাখালী খালের দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ের ২৫ হাজার ৮৮৫ বর্গফুট জায়গা দখল করে সেমিপাকা ঘর ও তেলের গোডাউন গড়ে তুলেছেন ফরিদ চেয়ারম্যান, ফরিদ সওদাগর, আক্তার সওদাগর, শফিউল আজম, বাবুল হাজি, মো. নাছের ও আবুল কালাম। রাজাখালী খালের উত্তর-পশ্চিম পাড়ে ১৮ হাজার ৭৩৫ বর্গফুট জায়গা দখল করে সেমিপাকা ঘর, গোডাউন, রাইস মিল, ভবন, খাদ্যের মিল ও মাদ্রাসা গড়ে তুলেছেন হাজি সিরাজুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, হাজি আবদুল ছোবহান গং, হাজি নবী হোসেন সওদাগর, বাদশা মিয়া চৌধুরী, সালাউদ্দিন, টাইগার ফরিদ, জামাল সওদাগর, পিউরিটি ময়দার মিল, ওসমান সওদাগর, আশু বাবু, কালাম সওদাগর, মো. এমরান, শাহীন স্টোর, গফুর ভিউ, জাফর, সিরাজ, আবদুল খালেক, আবদুল মালেক ও নুরুল ইসলাম সওদাগর।

রাজাখালী খালের দক্ষিণ-পূর্ব পাড়ে ১৩ হাজার ১৯২ বর্গফুট খালের জায়গা দখল করে সেমিপাকা কাঁচাঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন মো. কালাম, মো. জাহাঙ্গীর, মো. নেজাম, নুরুল ইসলাম, মো. জাহাঙ্গীর, জাগীর হোসেন, সেকান্দার, ভোলা মাঝি, জানে আলম, মরিয়ম বেগম, হালিমা বেগম, আবুল কাসেম, মো. আলী সাহেব, মো. ইসমাইল গং (২১ জন), রবি আলী, হাফিজিয়া মাদ্রাসা, কামাল মাঝি, মোজাহার কোম্পানি, হাজি আবুল কামাল ও জয়নাল আবেদীন আজাদ।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ জয়নিউজকে বলেন, খালের অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে ফাইলবন্দি করে রাখলে সে তালিকার কোনো মূল্য নেই। শিগগির খাল থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা না হলে একদিন খালগুলো চট্টগ্রামের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) প্রকৌশলী ও মেগা প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ মাঈনুদ্দীন জয়নিউজকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা বদ্ধপরিকর। খালের উপর কোনো অবৈধ স্থাপনা থাকলে সেগুলো অবশ্যই উচ্ছেদ করা হবে।

সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল শাহ আলী জয়নিউজকে বলেন, ইতোমধ্যে নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী। খালের উপর যত বড় প্রভাবশালীর স্থাপনাই থাকুক, অবৈধ হলে সেটি অবশ্যই সরিয়ে নিতে হবে।

জয়নিউজ/এমজেএইচ
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...