স্বপ্ন ছিল চট্টগ্রাম হবে চীনের সাংহাইয়ের আদলে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত হবে দেশের প্রথম টানেল, যার মাধ্যমে বদলে যাবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতি, গড়ে উঠবে নতুন শিল্পাঞ্চল, বাড়বে বিনিয়োগ, কমবে যাতায়াতের সময়, আর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যুক্ত হবে নতুন আয়ের ধারা।
কিন্তু বাস্তবতা যেন সেই স্বপ্নের সম্পূর্ণ উল্টো। প্রায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল আজ এমন এক আর্থিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে টোল থেকে আদায়কৃত অর্থ দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও মেটানো যাচ্ছে না।
যে প্রকল্পকে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেটিই এখন মাসে গড়ে ৮ কোটি টাকার ঘাটতি সৃষ্টি করছে।
এরই মধ্যে প্রকল্পের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ-বিলাসবহুল অতিথিশালা-এখন রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর আশায় ২৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সেতু বিভাগ।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে-যে অতিথিশালা নির্মাণের পর একদিনের জন্যও চালু হয়নি, সেটি আদৌ কেন নির্মাণ করা হয়েছিল?
উন্নয়নের আড়ালে বিলাসের অবকাঠামো
২০২৩ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উদ্বোধন হয় কর্ণফুলী টানেল।
একই প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা উপজেলার পারকি খালের পাশে প্রায় ৭২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয় বিশাল সার্ভিস এরিয়া।
শুরুতে এই সার্ভিস এরিয়া প্রকল্পের অংশই ছিল না। মাঝপথে এটি যুক্ত করা হয়। আর সেই সিদ্ধান্তের পরই প্রকল্প ব্যয় দ্বিতীয় দফায় জরুরি ভিত্তিতে বাড়ানো হয়।
সেখানে নির্মাণ করা হয়-প্রায় ছয় কক্ষবিশিষ্ট বিলাসবহুল অতিথিশালা, সুইমিংপুল, ৩০টি রেস্টহাউস, সম্মেলনকেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হেলিপ্যাড, জাদুঘর, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, মসজিদ এবং টানেলের রেপ্লিকা।
এসব স্থাপনায় বসানো হয়েছে ১ হাজার ১৮২ টন ক্ষমতার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি)। শুধু সার্ভিস এরিয়ার পেছনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪৫০ কোটি টাকা।
কখনোই চালু হয়নি অতিথিশালা
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো-নির্মাণ শেষ হওয়ার পর থেকে বিলাসবহুল অতিথিশালাটি একদিনের জন্যও চালু হয়নি।
সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা এর কারণ হিসেবে জনবলের অভাব উল্লেখ করলেও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাস্তবে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য সফরের কথা বিবেচনা করে।
অর্থাৎ জনসাধারণের ব্যবহার নয়, রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ের সফরকে কেন্দ্র করেই বিলাসবহুল এই অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
যে হিসাব বাস্তবে মেলেনি
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বলা হয়েছিল-প্রতিদিন চলবে, লাভজনক হতে প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে চলছে মাত্র চার হাজারের মতো যানবাহন।
অর্থাৎ পূর্বাভাসের মাত্র ১৪ শতাংশ। এর ফলও ভয়াবহ-মাসিক টোল আদায় প্রায় ৩ কোটি টাকা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা, মাসিক ঘাটতি প্রায় ৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ টানেল চালু রাখতেই প্রতি মাসে রাষ্ট্রীয় অর্থ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
লোকসান ঠেকাতে এখন ইজারার পথ
এই পরিস্থিতিতে সেতু বিভাগ অতিথিশালা ইজারা দিয়ে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অতিথিশালাসহ সার্ভিস এরিয়ার স্থাপনাগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়।
গত বছরের জুলাই ও সেপ্টেম্বরে দুই দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রত্যাশিত দর পাওয়া যায়নি। কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি।
স্থানীয় দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠান দর দিলেও তা সেতু বিভাগের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম হওয়ায় গ্রহণ করা হয়নি।
বর্তমানে তৃতীয় দফার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ১৩ জুলাই দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। এ পর্যন্ত ১৩টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান দরপত্র সংগ্রহ করেছে।
এর মধ্যে রয়েছে-জে এস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, চিটাগং এশিয়ান অ্যাপারেলস, এলভি স্ট্রাকচার, এটিএন হোমস, দি কক্স টুডে, সুইট ড্রিম ম্যানেজমেন্ট, রিচমন্ড হোটেল অ্যান্ড সুইট, খান প্রোপার্টিজ (যুক্তরাষ্ট্র), ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস, আরভিং হোটেল অ্যান্ড হসপিটালিটি এবং বেস্ট হোল্ডিং।
চুক্তি অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান ২৯ বছরের জন্য অতিথিশালা পরিচালনা করবে।
ইজারাদারের জন্য উন্মুক্ত ব্যবসা
ইজারাদার চাইলে-রুম সার্ভিস, রেস্টুরেন্ট, ভ্রমণসেবা, সম্মেলন আয়োজন, স্পা, অন্যান্য আতিথ্যসেবা চালু করতে পারবে এবং মূল্য নির্ধারণেও থাকবে স্বাধীনতা।
তবে নতুন কোনো স্থাপনা নির্মাণ বা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য সেতু কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, “টানেল প্রকল্প থেকে আয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই অতিথিশালা ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এগুলো নির্মাণে যে ব্যয় হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে একটা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। সে অনুযায়ী দর পাওয়া গেলে ২৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হবে।” সূত্র-প্রথম আলো
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইজারাদার না পাওয়ার অন্যতম কারণ প্রতিযোগিতামূলক অবকাঠামো।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন পারকি সৈকতের পাশে ১৩ একরের বেশি জমিতে ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি অত্যাধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণ করছে। এটি টানেলের অতিথিশালা থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে।
ফলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা বড় অঙ্কের বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
সরকারের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন অধিদপ্তরের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-টোল বাড়িয়ে লোকসান কমানো সম্ভব নয়।
বরং প্রয়োজন আনোয়ারা প্রান্তে দ্রুত শিল্পায়ন, কর্ণফুলী ড্রাই ডক উন্নয়ন, চায়না ইপিজেড, কোরিয়ান ইপিজেড, বন্দরভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা।
অর্থাৎ টানেলের সাফল্য শুধু একটি সড়ক প্রকল্পের ওপর নয়; পুরো অঞ্চলের শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
গত ৯ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকার আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সওজের তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার, মহেশখালীর মাতারবাড়ী পর্যন্ত নতুন অর্থনৈতিক করিডর তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কপথ প্রায় ৪০ কিলোমিটার কমবে এবং যাতায়াতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হবে।
বিশেষজ্ঞদের আশা, তখন টানেলের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
ব্যয়ের লাগাম কোথায় থেমেছিল?
২০১৫ সালে প্রকল্প অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। এরপর ২০২০ সালে ব্যয় বেড়ে হয় ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। ২০২১ সালে বাড়ে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা এবং সর্বশেষ ব্যয় দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা।
ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে জমি অধিগ্রহণ, শুল্ক ও কর বৃদ্ধি, পরিষেবা লাইন স্থানান্তর, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, অতিথিশালার আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও গৃহসজ্জা।
অর্থাৎ প্রকল্পের শেষ দিকে ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গেছে বিলাসবহুল অতিথিশালার সাজসজ্জায়।
কর্ণফুলী টানেল বাংলাদেশের প্রকৌশল ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। কিন্তু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য শুধু নির্মাণ শেষ হওয়ায় নয়। তার কার্যকর ব্যবহার, আর্থিক টেকসইতা এবং জনস্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।
আজ যখন টোলের আয় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও মেটাতে পারছে না, নির্মাণের পর থেকে বিলাসবহুল অতিথিশালা তালাবদ্ধ পড়ে আছে, আর শত শত কোটি টাকার সার্ভিস এরিয়া ইজারা দিয়ে লোকসান সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে-তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে: পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে সিদ্ধান্তগুলো কতটা জনস্বার্থনির্ভর ছিল?
এই প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন শুধু কর্ণফুলী টানেলের জন্য নয়, ভবিষ্যতের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর সুশাসন, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের কার্যকর ব্যবহারের জন্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।




