গবেষণায় কাঁচা দুধ, প্রসেসড দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত। ঢাকার বাজারের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনিতেও মিলেছে শত শত কণা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ গবেষকদের।
সকালের নাশতায় এক গ্লাস দুধ। চায়ের কাপে কয়েক চামচ চিনি। দিনের শুরুতেই যে খাবারগুলোকে পুষ্টি ও শক্তির উৎস হিসেবে ধরা হয়, সেখানেই যদি ঢুকে থাকে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণা-তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অজান্তেই আমরা আর কী গ্রহণ করছি?
বাংলাদেশে দুধ ও চিনির ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক দুটি গবেষণা সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে।
গবেষণায় কাঁচা দুধ, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রসেসড দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য এবং বাজারজাত ও খোলা চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে প্লাস্টিকের সংস্পর্শ থেকেই এসব ক্ষুদ্র কণা খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে।
দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষক।
সানাউল্লাহ মাজুমদারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের গবেষক দল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা দুধ এবং সুপারশপে বিক্রি হওয়া প্রসেসড দুধের নমুনা পরীক্ষা করেন।
গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশে দুধের মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও পলিমার ঝুঁকি নিয়ে এটিই প্রথম বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
গবেষণার ফল বলছে, প্রতি ১০০ মিলিলিটার প্রসেসড বা ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
একই পরিমাণ কাঁচা দুধে শনাক্ত হয়েছে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি কণা। আর অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ৭০ দশমিক ৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ, দুধের ক্ষেত্রে কাঁচা নমুনার তুলনায় প্রসেসড বা ব্র্যান্ডের দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে।
এই পার্থক্যই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে-দুধ উৎপাদনের পর থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত কোন কোন ধাপে প্লাস্টিকের সংস্পর্শ বাড়ছে?
গবেষকদের ধারণা, খামার থেকে দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিক পাইপে পরিবহন, কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিকের গ্লাভস ব্যবহার এবং বোতলজাতকরণের মতো বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের সংস্পর্শের কারণে প্যাকেটজাত দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
গবেষণাগারে উন্নত প্রযুক্তিতে বিশ্লেষণের পর দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া অধিকাংশ প্লাস্টিক কণা ছিল স্বচ্ছ এবং তন্তু বা আঁশের মতো।
নমুনাগুলোতে পিটিএফই বা টেফলন, পিইটি, নাইলন-৬ এবং পিভিসিসহ বিভিন্ন ধরনের পলিমারের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।
এখানেই উদ্বেগের আরেকটি দিক সামনে আসে। দুধ শিশুদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
বিশেষ করে ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের খাদ্যতালিকায় দুধের পরিমাণ বেশি থাকায় তাদের শরীরে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা প্রবেশের সম্ভাবনাও তুলনামূলক বেশি বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
দুধের পর এবার একই প্রশ্ন উঠছে চিনিকে ঘিরেও।
Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন এবং মোস্তাফিজুর রহমান।
ফলাফলও কম উদ্বেগজনক নয়। গবেষণায় ব্র্যান্ডেড চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা বা নন-ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
দুই ধরনের চিনির মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। তবে খোলা চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি ছিল।
চিনির নমুনায় শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর আকার ছিল প্রায় ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩ দশমিক ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত।
এর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ ছিল তন্তু বা ফাইবার, ২১ শতাংশ খণ্ড বা ফ্র্যাগমেন্ট, ১১ শতাংশ পাতলা স্তর বা ফিল্ম এবং ৫ শতাংশ গোলাকার কণা।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে এসব নমুনায় অ্যাক্রাইলোনাইট্রাইল বিউটাডিয়েন স্টাইরিন বা এবিএস, পলিভিনাইল ক্লোরাইড বা পিভিসি, পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট বা পিইটি, পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন বা পিটিএফই, উচ্চ ঘনত্বের পলিইথিলিন বা এইচডিপিই এবং নাইলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
দুটি গবেষণার ফল পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে-মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ শুধু কোনো একটি খাদ্যপণ্যের বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়।
খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং প্যাকেজিং-পুরো খাদ্যশৃঙ্খলেই প্লাস্টিকের ব্যবহার ও সংস্পর্শের বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
গবেষকদের মতে, প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা এবং পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা ক্ষয়প্রাপ্ত প্লাস্টিক থেকে এসব কণা খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে।
তবে এই গবেষণাগুলো যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এনেছে, তা শুধু খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে কি না-এখানেই সীমাবদ্ধ নয়।
প্রশ্ন হলো, নিয়মিত এসব কণা গ্রহণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য এর প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। যে দুধকে শিশুর বৃদ্ধি ও পুষ্টির অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই দুধেই যদি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায় থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করে, তাহলে খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
চিনির ক্ষেত্রেও একইভাবে নজরদারি জরুরি। ব্র্যান্ডেড ও খোলা-দুই ধরনের চিনিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাওয়ার তথ্য ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তা পরীক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
গবেষকদের মতে, খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কমাতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিং ব্যবস্থায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা এবং কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ জরুরি।
এখন প্রয়োজন শুধু গবেষণার ফল প্রকাশে সীমাবদ্ধ না থেকে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্রিয় নজরদারি।
দুধ ও চিনির মতো বহুল ব্যবহৃত খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি যখন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে, তখন নিয়মিত বাজার তদারকি, নমুনা পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ভোক্তা সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কতটা জরুরি-সেটিও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিক চোখে দেখা যায় না। স্বাদেও বোঝা যায় না। গন্ধেও ধরা পড়ে না।
অথচ গবেষণাগারের পরীক্ষায় তার উপস্থিতি যখন দুধ ও চিনির মতো প্রতিদিনের খাদ্যে শনাক্ত হচ্ছে, তখন প্রশ্নটি আর শুধু গবেষণার বিষয় থাকে না-এটি হয়ে ওঠে জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার সরাসরি প্রশ্ন।




