চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ব্যবসায়ী মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু হয়েছিল একটি খুনের রহস্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্য নিয়ে।
কিন্তু সেই তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই উন্মোচিত হয়েছে আরও বড় এক অন্ধকার জগতের চিত্র।
জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের দাবি, একটি হত্যার সূত্র ধরেই সামনে এসেছে অস্ত্র, চাঁদাবাজি, সীমান্তপথে পালিয়ে বেড়ানো, বিদেশি নম্বর থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কোটি টাকার চাঁদা আদায় এবং সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিস্তৃত কর্মকাণ্ড।
এই অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী চট্টগ্রামের আলোচিত অপরাধচক্রের অন্যতম সক্রিয় ব্যক্তি মোবারক হোসেন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’ এবং তাঁর চার সহযোগী।
ডিবির তদন্ত বলছে, এই গ্রেপ্তার কেবল পাঁচজন ব্যক্তিকে আটকের ঘটনা নয়, বরং এটি এমন একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান, যা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগর, ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করে এসেছে।
পুলিশের দাবি, এই চক্রের সদস্যরা শুধু অস্ত্র বহন করতেন না, বরং ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করতেন। চাঁদা না দিলে হত্যার হুমকি ছিল নিয়মিত কৌশল।
তদন্তের শুরু ১৩ জুনের মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা দিয়ে। ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ধামা ইলিয়াসকে।
আদালতের অনুমতিতে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তদন্ত নতুন মোড় নেয়।
পুলিশ বলছে, ধামা ইলিয়াসের দেওয়া তথ্য তাদের নিয়ে যায় অস্ত্রের গোপন আস্তানা এবং নেটওয়ার্কের আরও সক্রিয় সদস্যদের কাছে।
এরপর যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকায় যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার হন ডেভিড ইমনসহ আরও কয়েকজন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তখন সীমান্তপথে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, তিনি কয়েক দিন আগে একই সীমান্তপথ দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছিলেন এবং তাঁর যাতায়াত ছিল নিয়মিত।
এমনকি তাঁর কাছে একাধিক পাসপোর্ট থাকার তথ্যও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ির একটি পরিত্যক্ত টিলাবাড়িতে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং একাধিক ধারালো দেশীয় অস্ত্র।
প্রশ্ন উঠছে-একটি নির্জন পাহাড়ি বসতবাড়ি কীভাবে অস্ত্র মজুদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হলো?
স্থানীয় প্রশাসনের নজর এড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে এসব অস্ত্র সেখানে কীভাবে রাখা হয়েছিল? অস্ত্রগুলো কোন কোন অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে-এসব প্রশ্ন এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
ডিবি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অপরাধজগতে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন। মাত্র কয়েক বছরে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, বিদেশে অবস্থানকারী শীর্ষ অপরাধীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং তাদের হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সশস্ত্র কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের দায়িত্বও পালন করতেন।
তদন্তে উঠে এসেছে আরেকটি উদ্বেগজনক দিক। পুলিশ বলছে, বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের কাছে নিয়মিত ফোন করা হতো।
কখনো এককালীন কোটি টাকার চাঁদা, কখনো মাসিক চাঁদা-অস্বীকৃতি জানালেই দেওয়া হতো প্রাণনাশের হুমকি। ভয় সৃষ্টি করাই ছিল এই চক্রের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। অনেক ভুক্তভোগী নিরাপত্তাহীনতার কারণে অভিযোগই করেননি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা।
ডেভিড ইমনের ব্যক্তিগত জীবনও তদন্তে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় তিনি সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার ছিলেন। বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ে অনুশীলন করেছেন। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নেটেও বল করেছেন।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে তিনি ক্রিকেট থেকে হারিয়ে যান। এরপর তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ে সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে। কীভাবে একজন সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদ সংগঠিত অপরাধচক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠলেন-এ প্রশ্নের উত্তরও সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাগত গবেষণার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বিভিন্ন আলোচিত হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং সহিংস ঘটনায় তাঁর নাম উঠে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, একটি মামলায় গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে তাঁর অপরাধমূলক তৎপরতা আরও বিস্তৃত হয়।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, উচ্চঝুঁকির আসামিদের পর্যবেক্ষণ এবং পুনরায় সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ রোধে বিদ্যমান ব্যবস্থায় কোথায় দুর্বলতা রয়েছে।
মাকসুদুল হত্যা তদন্ত এখন আর শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
তদন্তকারীরা বলছেন, এই মামলার সূত্র ধরে অস্ত্রের উৎস, অর্থের জোগানদাতা, সীমান্তপথে যাতায়াতের নেটওয়ার্ক, বিদেশে অবস্থানকারী কথিত পৃষ্ঠপোষকদের যোগাযোগ এবং স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত আরও ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্তের প্রকৃত সাফল্য কেবল কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করার মধ্যে নয়, বরং পুরো নেটওয়ার্ক, অর্থায়নের উৎস, অস্ত্র সরবরাহ চেইন, সীমান্তসংযোগ এবং রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ-সবকিছু নিরপেক্ষভাবে উদ্ঘাটনের মধ্যেই নিহিত।
কারণ একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যদি সংঘবদ্ধ অপরাধের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে সেটি শুধু একটি মামলার অগ্রগতি নয়, বরং পুরো অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে-টিলার অস্ত্রভান্ডারের পেছনে কারা ছিল, অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এসেছে, বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে পরিচালিত চাঁদাবাজি নেটওয়ার্কে আর কারা যুক্ত, সীমান্তপথে যাতায়াত কীভাবে সম্ভব হয়েছে এবং এই চক্রের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা যাবে কি না।
এই প্রশ্নগুলোর নির্ভরযোগ্য উত্তরই নির্ধারণ করবে, মাকসুদুল হত্যা তদন্ত শেষ পর্যন্ত কেবল একটি মামলার চার্জশিটে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি চট্টগ্রামের সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের গভীরে পৌঁছানোর একটি নজির হয়ে উঠবে।




