ভূয়া বিল ও জালিয়াতি-রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পদায়ন বাণিজ্য

বিআরটিসির ট্রাক ডিপোতে মফিজ-কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

দুদকে ৪৩০ পাতার নথি সমেত অভিযোগ| তদন্তের দাবি

অনলাইন ডেস্ক

রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন-বিআরটিসি। সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াতের অন্যতম ভরসা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো ঘিরে উঠেছে বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ।

- Advertisement -

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডিপোটির সাবেক ইউনিট প্রধান (ম্যানেজার অপারেশন) মো. মফিজ উদ্দিন এবং সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর মো. কামরুজ্জামানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা।

- Advertisement -
google news follower

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের করা অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকারও বেশি অপচয়, ক্ষতি ও চুরির অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ভুয়া বিল, জ্বালানি ও ফেরি ব্যয়ের গরমিল, অগ্রিম ভাতা, মাইলেজ, টিএ/ডিএ এবং বিভিন্ন খাতে নগদ উত্তোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

- Advertisement -
islamibank

অভিযোগকারীর দাবি, শুধু জ্বালানি, গ্যারেজ, টুলস, ফেরি, প্রথম মাইলেজ ভাতা, দৈনিক ভাতা ও বিবিধ ব্যয়ের মতো কয়েকটি খাতেই ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ অর্থ উত্তোলন করে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার অপচয়, ক্ষতি ও আত্মসাৎ হয়েছে।

এসব অভিযোগের সমর্থনে ৪৩০ পাতার বেশি নথি ও তথ্য দুদকে জমা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

দুদকে দায়ের করা অভিযোগে চিহ্নিত প্রধান ব্যক্তিদের একজন মো. মফিজ উদ্দিন। তিনি ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ইউনিট প্রধান (ম্যানেজার অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ইউনিট প্রধানের পদ থেকে বদলি হয়ে বিআরটিসির প্রধান কার্যালয়ে অপারেশন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তাঁর দায়িত্বকালে ডিপোর বিভিন্ন আর্থিক খাতে নগদ অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে গুরুতর অসঙ্গতি তৈরি হয়। বিশেষ করে জ্বালানি, গ্যারেজ, ফেরি বিল, মাইলেজ, দৈনিক ভাতা এবং বিবিধ ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ফলে নথিপত্র যাচাই, সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত দায় নির্ধারণের দাবি উঠেছে।

অভিযোগে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মো. কামরুজ্জামান। তিনি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং অভিযোগ অনুযায়ী এখনও বিআরটিসিতে কর্মরত।

তার বিরুদ্ধেও ডিপোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন ব্যয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাশিয়ার মো. আ. করিম এবং হিসাব কর্মকর্তা মো. রমজান হোসেনের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের হিসাবেও অসঙ্গতি রয়েছে।

অভিযোগকারী এসব বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুদকের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে নগদ অর্থ উত্তোলনকে ঘিরে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন নির্ধারিত ব্যয়ের বিপরীতে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা হলেও সেই অর্থের প্রকৃত ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

জ্বালানি তেল, ফেরি ব্যয়, গ্যারেজ শ্রমিকের মজুরি, মাইলেজ, দৈনিক ভাতা এবং টিএ/ডিএসহ বিভিন্ন খাতে এমন ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ডিপোর রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।

এখন মূল প্রশ্ন-উত্তোলিত অর্থ কোথায় গেল? প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে হিসাবের মিল কতটুকু? যেসব বিল ও ভাউচারের বিপরীতে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবতা কতটা? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে কেবল পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট ও বিভাগীয় তদন্তে।

বিআরটিসির অভ্যন্তরে মফিজ উদ্দিন ও কামরুজ্জামানকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, মফিজ উদ্দিন অতীতে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো, কুমিল্লা ও বরিশালের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পালন করেছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি চট্টগ্রামের তৎকালীন এমপি ও মন্ত্রী নওফেলের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং ওই পরিচয়ের প্রভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে কামরুজ্জামানকে নিয়েও। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লায় হওয়ায় তিনি সাবেক এমপি শেখ সেলিমের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে পোস্টিং পেয়েছেন।

সম্প্রতি কামরুজ্জামানকে খুলনা বাস ডিপোর দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করেও বিআরটিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাদের প্রশ্ন, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন, তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ডিপোর দায়িত্ব দেওয়ার আগে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কি যথাযথ যাচাই করা হয়েছে?

প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ডিপো ও ইউনিটে পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না-এ প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।

বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অস্তিত্বের কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, বিআরটিসিতে ফ্যাসিস্ট সরকারের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। তারা নানান অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। শিগগির তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যের পর বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপো ও ইউনিটে দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা কথিত প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের সদস্যরা এখনো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন কি না-তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

বিআরটিসির সরকারি ওয়েবসাইটেও আব্দুল লতিফ মোল্লাকে চেয়ারম্যান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

পরিবহন খাতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সিন্ডিকেটের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কথা বলে আসছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান পরিবহন খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও সিন্ডিকেটের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।

মো. মফিজ উদ্দিন ও মো. কামরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাদের কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্র-এবি

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ