কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩)।
বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে গত শুক্রবার দুপুরে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী। কিন্তু এরপর আর বাড়ি ফেরা হয়নি তার।
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
মর্মান্তিক এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১২ ঘণ্টার মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
আজ রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর ১২ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজন আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, আগে তিনজন এবং আজ আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মোট চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এ ঘটনায় আইন অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ঘটনায় পুলিশের প্রশংসা করতে হবে এ কারণে যে, হত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিক সব তথ্য-উপাত্ত তারা দ্রুততম সময়ে উদ্ধার করেছে।
তিনি বলেন, এখানে আমরা পুলিশের প্রশংসা করতে পারি যে তারা ১২ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মামলার তদন্তে ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অপ্রতিমের পোস্টমর্টেম সম্পন্ন হয়েছে এবং পরে তার দাফন করা হয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অনেকটা কিশোর অপরাধীর মতো। তারা অনেকটা কিশোর অপরাধ চক্রের মতো।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে অপ্রতিমের সম্পর্ক, ওঠাবসা ও বন্ধুত্ব ছিল। তাদের বয়স নিহত অপ্রতিমের চেয়ে ৫ থেকে ১০ বছর বেশি।
হত্যার সময় অপ্রতিমের কাছে থাকা মুঠোফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি ঘটনাস্থল ও তদন্তসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আলামত পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত দেওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, পল্লবীর ওই ঘটনার মতো অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন যাতে দ্রুত দেওয়া যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডকে মর্মান্তিক উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কুমিল্লার এ ঘটনায় দেশের মানুষ মর্মাহত। সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরেই শুরু হয়েছে এবং এর বিভিন্ন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমাজের সব সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অপরাধের পেছনে অনেক ক্ষেত্রে মাদক ও জুয়ার সংশ্লিষ্টতা দেখা যায় উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ সমস্যা সমাধানে মোটিভেশনাল কার্যক্রম বাড়াতে হবে। স্কুলের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আরও জোর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
অপরাধের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের পর বিচার হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অপরাধ সংঘটিত হলে সেটার বিচার হচ্ছে কি না, সেটা দেখতে হবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিটি জঘন্য অপরাধের ঘটনার রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। যেসব ঘটনা সময়সাপেক্ষ, সেগুলোর কার্যক্রমও চলছে।
গত শুক্রবার দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে এ ঘটনায় তদন্ত শুরু হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
অপ্রতিম কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকত সে।
তার মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ব্যবসা করেন।
একটি পরিবারের একমাত্র সন্তানের এমন মর্মান্তিক পরিণতি স্বাভাবিকভাবেই কুমিল্লাজুড়ে শোকের আবহ তৈরি করেছে।
এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা কীভাবে ঘটেছিল, তার বিস্তারিত তথ্য সামনে আসার অপেক্ষায় পরিবার ও স্বজনরা।




