ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার অঙ্গীকার করেছেন। তাঁর ভাষায়, দেশে ফেরার প্রশ্নটি এখন ‘কখন’ নয়, বরং কীভাবে দেশে ফিরবেন, সেটিই মূল বিষয়।
একই সঙ্গে দেশে ফিরে কারাবাসসহ আইনি পরিণতি মোকাবিলার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন তিনি।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি নিজের দেশে ফিরতে চান এবং প্রত্যাবর্তনটি শান্তিপূর্ণভাবে ও আইনের কাঠামোর মধ্যেই করতে চান। তবে দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।
এনডিটিভির ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে তাঁর দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তবে ভারত বা বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে কোনো সরকারি কিংবা গোপন যোগাযোগ হয়েছে কি না-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি। তিনি শুধু চলমান আলোচনা ও নানা জল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে ওই রায়কে শেখ হাসিনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন এবং রায়ের ন্যায্যতা নিয়ে আপত্তি জানান।
একই সঙ্গে দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার বা কারাবাসসহ আইনি পরিণতি মোকাবিলা করতে তিনি প্রস্তুত বলেও জানান। বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁর আইনি অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ ও ট্রাইব্যুনালের বক্তব্য হলো, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই বিচারিক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। রায়টি অনুপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছিল।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারা দেশে শত শত মামলা রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর গবেষণায় ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁকে আসামি করে ৬৬৩টি মামলা দায়েরের তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে ৪৫৩টি ছিল হত্যা মামলা।
এসব মামলার মধ্যে বিভিন্ন থানায় দায়ের করা ফৌজদারি মামলাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় রায় হওয়ায় অন্য মামলাগুলোর কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় না।
আইন অনুযায়ী সেসব মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া পৃথকভাবে চলতে পারে বলে আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এরই মধ্যে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে জুলাই আন্দোলনসংক্রান্ত দুটি মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৬৩ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযোগপত্র দিয়েছে। এর একটি হত্যা এবং অন্যটি হত্যাচেষ্টার মামলা।
৫ আগস্ট ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যান। এরপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে।
ভারত এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথা জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
তবে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট-তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার লক্ষ্য থেকে সরে আসছেন না। কিন্তু কীভাবে তিনি দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি।
ফলে তাঁর ঘোষিত সময়সীমা সামনে রেখে প্রত্যাবর্তনের আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তাঁর দাবি, দলটির সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন এবং সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে।
তিনি আওয়ামী লীগকে আবারও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার কথা বলেন এবং গণতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য তুলে ধরেন।
তবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতায় দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্নও রয়েছে।
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হুমকির কথাও বলেন শেখ হাসিনা।
এ ধরনের হুমকি মোকাবিলায় গোয়েন্দা সক্ষমতা, আইন প্রয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শেখ হাসিনার মতে, উগ্রবাদের হুমকি কোনো একটি দেশের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার সর্বশেষ বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে শত শত মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়, অন্যদিকে তিনি প্রকাশ্যেই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার অঙ্গীকার করছেন।
তিনি দেশে ফিরলে তাঁকে ঘিরে থাকা মামলা, বিচারপ্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনালের রায়ের আইনি পরিণতি কীভাবে কার্যকর হবে-সেটিও সামনে আসবে।
পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসের আইনি, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক এর ওপর।




