কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নামজারি-জমাভাগ (মিউটেশন) খতিয়ান সৃজনকে কেন্দ্র করে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, অর্থ দাবি এবং হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ লোকমানের অভিযোগ, তাঁর নিজের এবং তাঁর ভাতিজি শিরিন আক্তারের নামে করা দুটি নামজারি মামলার কাজ এগিয়ে নিতে প্রথমে কয়েক হাজার টাকা নেওয়া হলেও পরে প্রতিটি মামলার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে মোট এক লাখ টাকা দাবি করা হয়।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মোহাম্মদ লোকমান।
অভিযোগের সঙ্গে টাকা পাঠানোর বিকাশের স্ক্রিনশটসহ সংশ্লিষ্ট নথি রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন। একই সঙ্গে বিষয়টি জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর জানানোর কথাও জানিয়েছেন তিনি।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার মো. জহির রায়হান এবং তাঁর সহকারী হিসেবে কাজ করা কেজুয়াল কর্মী মো. শহীদ।
প্রথমে ছয় হাজার, পরে এক লাখ টাকা দাবির অভিযোগ
মোহাম্মদ লোকমানের ভাষ্য, ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর এবং ১২ আগস্ট তিনি পৃথক দুটি নামজারি-জমাভাগের আবেদন করেন। এর একটি তাঁর নিজের নামে এবং অন্যটি তাঁর ভাতিজি শিরিন আক্তারের নামে।
আবেদনসংক্রান্ত কাজে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগাযোগের পর শহীদ নামের ওই কর্মী তাঁকে তহসিলদার জহির রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
এরপর তহসিলদার জহির রায়হান সরেজমিনে গিয়ে জমি পরিমাপ করেন। লোকমানের অভিযোগ, জমি পরিদর্শন ও পরিমাপের পর তাঁকে জানানো হয়, নামজারি করতে হলে টাকা দিতে হবে।
লোকমানের দাবি, প্রথমে প্রতি মামলার বিপরীতে ১০ হাজার টাকা করে চাওয়া হয়েছিল। পরে শহীদের মাধ্যমে তিনি দুই দফায় মোট ছয় হাজার টাকা দেন। এর মধ্যে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর প্রমাণও তাঁর কাছে রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে ওই টাকা দেওয়ার পরও নামজারি-জমাভাগের কাজ সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ করেন লোকমান।
তাঁর ভাষ্য, কখনো কাগজপত্রে ত্রুটির কথা বলা হয়েছে, আবার কখনো অন্য অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে।
‘টাকা না দিলে ফাইল পাস হবে না’
লোকমানের অভিযোগ, সরেজমিনে জমি পরিমাপের পর তাঁকে জানানো হয়, বিএস খতিয়ানে তাঁর হিস্যা সঠিকভাবে উল্লেখ নেই।
অথচ সংশ্লিষ্ট বিএস খতিয়ান এবং পূর্বের ভূমি-সংক্রান্ত কাগজপত্রে বিষয়টি থাকার কথা বলে দাবি করেন তিনি।
লোকমান বলেন, তিনি জানতে চান, পূর্বের রেকর্ডে কোনো ভুল থাকলে তার দায় কেন তাঁর ওপর বর্তাবে। তাঁর দাবি, তখন তাঁকে বলা হয়, অফিসের ভুল হলেও সংশোধন করতে টাকা লাগবে।
সর্বশেষ ভূমি অফিসে গিয়ে নিজের দুটি ফাইলের বিষয়ে জানতে চাইলে তহসিলদার জহির রায়হান তাঁর কাছে টেবিলের টাকা দাবি করেছেন বলে অভিযোগ করেন লোকমান।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে বলা হয়েছে-টাকা না দিলে ফাইল পাস হবে না। দুইটি নামজারি মামলার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে মোট এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মোহাম্মদ লোকমানের অভিযোগ, তিনি দেশের বাইরে থাকার সময় তাঁর বোনের জামাই কাদের ভূমি অফিসে অন্য একটি কাজে গেলে তাঁকে ডেকে নিয়ে তাঁর (লোকমানের) সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করার কথা বলা হয়।
লোকমানের দাবি, তহসিলদার জহির রায়হান ও শহীদ তাঁর বোনের জামাইকে বলেন, তাঁর শালাকে তাঁদের সঙ্গে সমঝোতা করতে বলতে। তা না হলে তাঁর বিএস দেওয়া হবে না-এমন কথাও বলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
লোকমানের ভাষায়, ‘সমঝোতা’ না করলে নামজারির কাজ হবে না-এমন বার্তা বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁকে দেওয়া হচ্ছে।
‘অফিস খরচ’ হিসেবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ
লোকমানের অভিযোগ, শহীদ তাঁর কাছ থেকে প্রথমে অফিস খরচের কথা বলে টাকা নেন। কখনো অফিসে ফ্যান নেই, কখনো বাসার ছাউনি ভালো নয়-এ ধরনের কথা বলা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, এসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সহযোগিতার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, শহীদকে প্রথমে ৫ হাজার ৭৫ টাকা এবং পরে আরও ১ হাজার টাকা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ছয় হাজারের বেশি টাকা দেওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
লোকমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে ওই ছয় হাজার টাকা কেন দেওয়া হয়েছিল, তিনি বলেন, তাঁকে বলা হয়েছিল এগুলো ‘অফিস খরচ’।
লোকমানের দাবি, জমিটি কেনার আগেই তিনি সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে গিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, জমিটির কোনো সমস্যা আছে কি না এবং ভবিষ্যতে নামজারি করা যাবে কি না।
তাঁর ভাষ্য, তখন তাঁকে জানানো হয়েছিল, নামজারি করা সম্ভব হবে। পরে ভূমি অফিসের মাধ্যমে খাজনার দাখিলাও কাটা হয়। সেই দাখিলা পাওয়ার পর তিনি জমিটি রেজিস্ট্রি করেন।
কিন্তু জমি কেনার পর নামজারি করতে এসে তাঁকে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
লোকমানের ভাষ্য, সংশ্লিষ্টরা তাঁকে বলেন, এলাকাটি ‘ডিমান্ডেবল’ বা মূল্যবান জায়গা। তাই নামজারির জন্য আলাদা অর্থ দিতে হবে।
লোকমানের অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-যে ত্রুটির কথা দেখিয়ে তাঁর কাছে টাকা দাবি করা হচ্ছে, সেটি যদি পূর্বের ভূমি রেকর্ডের ভুল হয়, তাহলে সেই ভুল সংশোধনের দায় সেবাগ্রহীতার ওপর কেন বর্তাবে?
তিনি বলেন, খাজনার দাখিলা কাটার সময় সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস যদি কোনো আপত্তি বা সমস্যা দেখাত, তাহলে তিনি জমিটি রেজিস্ট্রি করতেন না।
কিন্তু খাজনা গ্রহণের পর এবং জমি রেজিস্ট্রির পর নামজারি করতে গিয়ে নতুন করে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর।
শুধু নিজের ঘটনা নয়, একই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও সেবাগ্রহীতাকে হয়রানি ও অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন লোকমান।
তাঁর ভাষ্য, তাঁর পার্শ্ববর্তী এলাকার এক ব্যক্তি ওয়ারিশসূত্রে জমির নামজারি/রেকর্ড সংশোধনের জন্য আবেদন করেছেন। ওই আবেদনেও একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
অভিযোগে শহীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন লোকমান। তাঁর দাবি, শহীদ একজন কেজুয়াল কর্মী হওয়া সত্ত্বেও ভূমি অফিসের সেবা-সংক্রান্ত কাজে অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
লোকমানের অভিযোগ, তহসিলদার জহির রায়হানের হয়ে শহীদ টাকা সংগ্রহ করেন। এমনকি ভূমি অফিসের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
মোহাম্মদ লোকমানের অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসন। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নবনিযুক্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে।
কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রিদওয়ানুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের জন্য নবনিযুক্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়ে পত্র পাঠানো হবে।
অভিযোগের বিষয়ে তহসিলদার মো. জহির রায়হানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এর আগে তাঁর কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। একইভাবে অভিযোগে উল্লেখিত মো. শহীদের বক্তব্যও নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের পক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাঁরা বক্তব্য দিলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
ভূমি অফিসে নামজারি-জমাভাগের মতো নাগরিকসেবার ক্ষেত্রে নির্ধারিত সরকারি ফি ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো অর্থ দাবি করা হয়ে থাকলে তা গুরুতর প্রশাসনিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
বিশেষ করে কোনো নথিগত ত্রুটি বা প্রশাসনিক জটিলতার দায় দেখিয়ে সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দাবি করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
মোহাম্মদ লোকমানের অভিযোগের সত্যতা, বিকাশে অর্থ পাঠানোর নথি, সংশ্লিষ্ট নামজারি মামলার কাগজপত্র, সরেজমিন পরিদর্শনের তথ্য এবং ভূমি অফিসের নথি-সবকিছু যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও মনে করেন, ভূমি অফিসে সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানি বা অনৈতিক অর্থ দাবির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।




