মানুষের সব কষ্ট চোখে দেখা যায় না, সব সংকটের কথাও মুখে বলা হয় না। হাসিমুখের আড়ালেও জমে থাকতে পারে উদ্বেগ, বিষণ্নতা কিংবা গভীর মানসিক চাপ।
এমন পরিস্থিতিতে কারও কথা মন দিয়ে শোনা, তার আচরণের পরিবর্তন লক্ষ করা এবং প্রয়োজনের সময় সঠিক সহায়তার পথ দেখানো হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই মানবিক বোধকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে রাজধানীর উত্তরায় আয়োজন করা হয় ‘মেন্টাল হেলথ অ্যাম্বাসেডর ট্রেনিং’।
গত ১০ অক্টোবর (শনিবার) উত্তরার জমজম টাওয়ারে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান লাইফস্প্রিং আয়োজিত দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থী, চিকিৎসকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ৩৫০ জনেরও বেশি মানুষ অংশ নেন।
আলোচনা, প্রশ্নোত্তর ও মতবিনিময়ে প্রাণবন্ত আয়োজনটিতে উঠে আসে মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা, প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ, আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনীয় পেশাদার সহায়তা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা এখনও আমাদের সমাজে অনেকের জন্য কঠিন। সামাজিক সংকোচ, লজ্জা কিংবা অন্যের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় অনেকে নিজের সমস্যার কথা প্রকাশ করতে চান না।
আবার কাছের মানুষের আচরণে পরিবর্তন দেখেও অনেক সময় তা বোঝার বা যথাযথভাবে পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয় না।
এ বছরের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Lived Experiences Heard: Real Voices, Real Change’ এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য ছিল সেই নীরবতা ভাঙা।
মানুষের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা, মানসিক সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উপযুক্ত সেবার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের প্রস্তুত করাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
আয়োজনে বিশেষজ্ঞরা মানসিক স্বাস্থ্যকে কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও বৃহত্তর সমাজের সম্মিলিত সচেতনতার বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে আলোচনা করেন কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ মুনমুন জাহান। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা টানাপোড়েনের মধ্যে কীভাবে নিজের মানসিক সুস্থতার যত্ন নেওয়া যায়, সে বিষয়ে তিনি দিকনির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে কোন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া জরুরি, সেই বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন তিনি।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ গোলাম মুস্তফা মিলন আলোচনা করেন মানসিক রোগ ও যৌনস্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে।
সমাজে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত এই বিষয়ে লজ্জা ও সংকোচ কাটিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে যথাসময়ে সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব পায়।
চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ হুমাইরা শাহজাহান হৃদি কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ে আলোচনা করেন। সম্ভাব্য সতর্কতামূলক সংকেত শনাক্ত করা, সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
অন্যদিকে, চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ তৌহীদা ফেরদৌসি শিশু-কিশোরদের আচরণগত পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেন।
বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দেখা দেওয়া পরিবর্তন এবং বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন এমন আচরণের মধ্যে পার্থক্য বোঝার বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের এসব আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়, মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতার ক্ষেত্রে শুধু সমস্যা দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়াও শুরুতেই পরিবর্তনগুলো বুঝতে শেখা এবং সহমর্মিতার সঙ্গে পাশে দাঁড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
আয়োজনটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল লাইফস্প্রিংয়ের উত্তরা শাখার পেশাদারদের সরাসরি অংশগ্রহণ। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের পাশাপাশি তাঁরা ৫০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারীকে বিনামূল্যে পরামর্শসেবা দেন।
অনেকের জন্য এই সুযোগ ছিল মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার প্রথম অভিজ্ঞতা। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দ্বিধা ও সংকোচ কাটিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাও এ ধরনের উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বেসরকারি খাতে বিগত ৯ বছর ধরে লাইফস্প্রিং মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় শীর্ষস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি দেশজুড়ে এ ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করে আসছে।
প্রতিষ্ঠানটি অনলাইন ও অফলাইনে বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের ৩৬টিরও বেশি দেশে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় তিনটি শাখার পাশাপাশি চট্টগ্রাম শাখাতেও রয়েছে নিয়মিত সেবার ব্যবস্থা।
এরই ধারাবাহিকতায় আয়োজিত ‘মেন্টাল হেলথ অ্যাম্বাসেডর ট্রেনিং’-এর লক্ষ্য শুধু একটি দিনের প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা আরও বিস্তৃত হবে-এমন প্রত্যাশা আয়োজকদের।
কারণ, মানসিক স্বাস্থ্যসচেতন সমাজ গড়ে তুলতে সব সময় বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না।
কখনো প্রয়োজন হয় শুধু একজন মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সংকটের মুহূর্তে সঠিক সহায়তার পথ দেখানো।
সেই মানবিক চর্চাকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা নিয়েই শেষ হয় লাইফস্প্রিংয়ের এই দিনব্যাপী আয়োজন।




