পাবনার আতাইকুলার পুষ্পপাড়া বাজারে সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে ছয় মুখোশধারীর সশস্ত্র হামলা। মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে গুলিতে প্রাণ হারালেন বিএনপি নেতা রিপন হোসেন ও হাটের ইজারাদার আব্দুস সালাম।
হামলার পর ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে পশ্চিম দিক দিয়েই পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পুরো হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য ধরা পড়েছে বাজারের সিসিটিভি ক্যামেরায়।
সন্ধ্যা তখন ৬টা ৪১ মিনিট। প্রতিদিনের মতোই চলছিল বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম। হঠাৎ পশ্চিম দিক থেকে এসে হাজির হয় ছয় মুখোশধারী দুর্বৃত্ত।
কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।
মাত্র এক মিনিট। এর মধ্যেই গুলিতে প্রাণ হারান দুই ব্যক্তি। হত্যাকাণ্ড শেষে ফের পশ্চিম দিক দিয়েই পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
যাওয়ার সময়ও ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকে তারা, যাতে ভয়ে আশপাশের কেউ এগিয়ে আসার সাহস না পায়।
পাবনার আতাইকুলার পুষ্পপাড়া বাজারে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের এমনই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সিসিটিভি ফুটেজে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে পাবনা সদর উপজেলার আতাইকুলা থানার ঢাকা-পাবনা মহাসড়কসংলগ্ন পুষ্পপাড়া বাজারে এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নিহত দুজন হলেন বিএনপি নেতা রিপন হোসেন (৪০) এবং পুষ্পপাড়া হাটের ইজারাদার আব্দুস সালাম (৫০)।
রিপন হোসেন ধর্মগ্রাম এলাকার মৃত ওমেদ আলীর ছেলে। তিনি আতাইকুলা থানা বিএনপির সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক এবং আতাইকুলা ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি ছিলেন।
অপর নিহত আব্দুস সালাম একই এলাকার মৃত আরজ আলী ব্যাপারীর ছেলে। তিনি পুষ্পপাড়া হাটের ইজারাদার ছিলেন। শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আব্দুস সালাম। তবে স্থানীয় সূত্রের দাবি, ৫ আগস্টের পর তাকে জামায়াতের বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে দেখা গেছে।
পুষ্পপাড়া বাজারের মানুষের কাছে এমন হত্যাকাণ্ড নতুন নয়। তবে এক যুগ পেরিয়েও অতীতের সেই ভয়াবহ স্মৃতি ভুলতে পারেননি স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৩০ মে সন্ধ্যায় এই একই বাজারে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে চারজনকে হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা। চাঞ্চল্যকর সেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনো উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ বলে দাবি স্থানীয়দের।
দীর্ঘ ১২ বছর পর একই বাজারে আবারও প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে দুজনকে হত্যার ঘটনায় নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। বাজারের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ-সবার মনেই এখন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
শুধু পুষ্পপাড়া বাজার নয়, চরমপন্থি তৎপরতার জন্য অতীতে পরিচিত আতাইকুলার বিভিন্ন এলাকাতেও একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফলে নতুন এই জোড়া হত্যাকাণ্ড স্থানীয়দের মধ্যে পুরোনো ভয় ও অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক বিরোধ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন নিহত আব্দুস সালামের ভাই আব্দুল কালাম।
তিনি বলেন, আমার পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার জন্যই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। ২০১৪ সালের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আমাদের পরিবারের সদস্যদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছিল।
ওই হত্যাকাণ্ডের সময় আমি জেলে ছিলাম, তারপরও আমার নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। এই এলাকায় অপরাধীরা আমাদের কারণে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ করতে পারে না। এ জন্যই তারা আমাদের পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে।
তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশরাফ।
তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে।
আতাইকুলা অঞ্চল আগে থেকেই চরমপন্থি তৎপরতাসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য পরিচিত উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, আগের তুলনায় বর্তমানে এ অঞ্চলে অপরাধের মাত্রা কমেছে।
তিনি আরও বলেন, আমি পাবনায় আসার পর গত তিন মাসের মধ্যে এই প্রথম এ ধরনের ঘটনা ঘটল। আশা করি, অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পারব।




