শনিবার উদ্ধোধন হচ্ছে বঙ্গবন্ধু টানেল, বদলে যাবে চট্টগ্রাম

প্রাচ্যের রাণী চট্টগ্রামের অবস্থান যেমন বৈশিষ্টপূর্ণ,তেমনি সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি-অর্থনীতি, ধর্ম-ভাষা-সাহিত্য সবক্ষেত্রে এখানকার জনগোষ্ঠীর কাজকর্ম স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত, স্বকীয়তার সমুজ্জল। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এই জেলা ও মহানগরকে দেশের এক অনবদ্য স্থানে পরিনত করেছে। পাহাড়, সমুদ্র, উপত্যকা, অরণ্য প্রভূতি নৈসর্গিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে এই জেলা পরিনত হয়েছে প্রকৃতির লীলা নিকতনে। চট্টগ্রামের আছে অফুরন্ত সম্ভাবণা। কিন্তু সেই সম্পদ ও সম্ভবনাকে মোটেই কাজে লাগানো হচ্ছিল না বলে ছিল দীর্ঘ।

- Advertisement -

আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা এ জনপদের উন্নয়নের ভার নিজের কাধে নেওয়ার পর থেকে চট্টগ্রামের চেহারা পাল্টাতে শুরু করে। দেশে কয়েকটি বড় মেঘা প্রকল্পের মধ্যে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান টানেল নির্মাণ করে আলোড়ন সৃষ্টি করে। দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর তলদেশে প্রথম টানেলের গৌরব গাঁথা চট্টগ্রামের শিরোপায় রচিত হয়। ২৮ অক্টোবর এ টানেল উদ্বোধনের শুভক্ষণ। এ টানেলের কারণে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লিবিক উন্নয়ন তত্বন্বিত হবে। চট্টগ্রামে ওয়ান সিটি টু টাউনে রূপান্তিত হবে। পাল্টে যাবে কর্ণফুলীর এপার-ওপার

- Advertisement -
google news follower

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত এই টানেল দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সড়ক পথ। ৩৫ ফুট চওড়া ও ১৬ ফুট উচ্চতর দু’টি টিউব ১১ মিটার ব্যবধানে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ভারী যানবাহন সহজে টানেলের মধ্যদিয়ে চলাচল করতে পারে। বাস্তবায়নাধীন টানেলের দৈর্ঘ্য হবে ৩.৪০ কিলোমিটার। এতে ৫.৩৫ কিলোমিটারের একটি অ্যাপ্রোচ রোড ও একটি ৭৪০ মিটার ব্রিজের পাশাপাশি মূল শহর, বন্দর এবং নদীর পশ্চিম দিককে পূর্ব দিকের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। টানেলের দুই প্রান্তে দুটি বিদ্যুৎ সাব-স্টেশনও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যাতে টানেলের অভ্যন্তরে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু থাকে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় টানেলের টিউব দু’টির মধ্য দিয়ে সর্বোচ্চ ৩-৪ মিনিটের মধ্যে পার হওয়া যাবে এপাড় থেকে ওপাড়ে। এই প্রকেল্পর মোট ব্যয় হচ্ছে ১০ হাজার ৬৮৯.৭১ কোটি টাকা।

টানেলের দুই প্রান্তের ইকোনমিক করিডোর

- Advertisement -
islamibank

দক্ষিণ-পূর্বে আনোয়ারা প্রান্তে টানেলের মুখ একদিকে পটিয়া হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ন্যাশনাল হাইওয়ে-১ এর সাথে সংযুক্ত হয়েছে যা ইতোমধ্যে সম্প্রসারণের কাজ বাস্তবায়নাধীন। একই প্রান্তে বাঁশখালী-পেকুয়া এর সাথে সংযুক্ত সড়কটি সরকারের নতুন পরিকল্পনা মোতাবেক বাঁশখালী-পেকুয়া-চকরিয়া-ঈদমনি-খুরুশকুল হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে যারফলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ৩৫-৪০ কিলোমিটার কমে যাবে। এছাড়া এই নতুন পরিকল্পিত রুটের সাথে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত একটি এক্সপ্রেসওয়ে তৈরী করা যেতে পারে যা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের দূরত্ব প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার কমিয়ে আনতে পারে। টানেলের চট্টগ্রাম শহরের পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট ৩-৪ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম বন্দর প্রায় ১৫-১৬ কিলোমিটার এবং একই প্রান্ত থেকে মেরিন ড্রাইভ হয়ে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দূরত্ব আনুমানিক ২০ কিলোমিটার।

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে সড়কপথে ভারতের উত্তর প্রদেশ ও সেভেন সিস্টারে আমদানিকৃত পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে। সুযোগ রয়েছে পাহাড় ও সমতলবেষ্টিত প্রতিবেশী দেশ নেপাল এবং ভুটানেরও। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ সম্পন্ন হলে ট্রানজিটের ব্যবহার আরো বৃদ্ধি পাবে। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু টানেল বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটির নতুন স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে এ টানেলকে ঘিরে।

বন্দরনগরীকে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ মডেলে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রামকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ প্রান্তে আনোয়ারাকে যুক্ত করেছে এই টানেল। এর মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকাগামী যানবাহনকে আর মহানগরের অভ্যন্তরে ঢুকতে হবে না। টানেল ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে চলে যাবে গন্তব্যে।

পরিকল্পনাধীন সময়ের এক সমীক্ষায় দেখা যায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধির জন্য টানেল অর্থনৈতিকভাবে খুবই জরুরী ভূমিকা রাখবে এবং ওই সমীক্ষায় বলা হয় টানেল দিয়ে বছরে ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করতে পারবে। প্রতিদিন চলাচল করতে পারবে অন্ততঃ সাড়ে ১৭ হাজার গাড়ি। ২০২৫ সাল নাগাদ টানেল দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন যাতায়াত করতে পারে বলেও ধারণা করা হয়। তাই এই বিপুল পরিমাণ ট্রাফিক পূর্বের দুই সেতু এবং চট্টগ্রাম শহরের উপরে যে যানজটের চাপ সৃষ্টি করতে পারে তার সমাধান ও বিকল্প হিসেবেই এই টানেল চট্টগ্রাম নগরীর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল তৈরির কাজ শুরুর পর থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে নদীর দুই তীর ধরে নগর সম্প্রসারণের কাজ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সিডিএ। চট্টগ্রাম নগরের মাস্টার প্ল্যানে কর্ণফুলী নদীর দুই তীর ও বঙ্গোপসাগর উপকূলে অন্তত ১১টি উপশহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি।

টানেলকে ঘিরে শিল্পায়ন

টানেল নির্মাণকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে গড়ে উঠছে বড় বড় বিনিয়োগ। বর্তমানে কর্ণফুলী নদীর ওপারে রয়েছে প্রায় ২,৫০০ একরের উপর কারিয়ান ইপিজেড। দক্ষিণ এশিয়ায় এ প্রথম টানেল নির্মাণের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আনোয়ারার একটি ইকোনমিক জোন স্থাপন করছে সরকার। বেজার তথ্যমতে কর্ণফুলী দক্ষিণপাড়ে আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৮০০ একর জায়গার উপর গড়ে তোলা হচ্ছে চাইনিজ ইকোনোমিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্যভূক্ত অনেকে বিনিয়োগ করছে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায়। এছাড়া টানেলের দক্ষিণ পাড় থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত চার লেনের সড়কের পাশে কারখানা স্থাপনের জন্য অনেকেই ক্রয় করেছেন ভূমিও। শিল্পায়নের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে টানেলকে ঘিরে যারফলে স্বাভাবিকভাবে আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে টানেলের মধ্য দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচলের সংখ্যা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। টানেলের আশেপাশের অঞ্চলের সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাত পর্যটন খাত কক্সবাজারের পরে পর্যটনের আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ও আনোয়ারা পার্কি বিচ। আগে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত থেকে সড়ক পথে শহরের মধ্য দিয়ে আনোয়ারা যেতে সময় লাগতো ৪ ঘন্টা। বঙ্গবন্ধু টানেল বাস্তবায়িত হওয়ায় এই সময় নেমে আসবে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটে। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র নদীর তলদেশে এই টানেল হওয়ায় এই স্থাপনাকে ঘিরে আকর্ষণ বাড়বে দর্শনার্থীদের। পাশাপাশি ফৌজদারহাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ এবং ফৌজদারহাট এলাকায় গড়ে ওঠা দৃষ্টিনন্দন ডিসি পার্ক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। কক্সবাজার জেলায় গড়ে উঠছে সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক, শাবরাং ট্যুরিজম ও টেকনাফে নাফ ট্যুরিজম পার্ক। এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরের মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী মোট প্রায় ৫০ কিলোমিটারের কোস্টাল লাইন রয়েছে। যারমধ্যে পোর্ট, শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ইত্যাদি ছাড়াও প্রায় ২০ কিলোমিটারের কোস্টাল লাইনজুড়ে কোস্টাল টুরিজ্যম প্রসারের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

জেএন/এফও/এমআর

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ