ইয়াবার টাকার ভাগ না পেয়ে কিশোরকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ গুম। চার বছর পর সেই নৃশংসতার পর্দা উন্মোচিত হলো আদালতে দেওয়া এক স্বীকারোক্তিতে।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার উঁচুর বিল পুরানগড় এলাকার পাহাড়ঘেরা জনপদে ২০২২ সালের ১৭ জুলাই রাতে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি খুন নয়। এটি লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা ও অপরাধের নির্মম মেলবন্ধনের এক ভয়ংকর উদাহরণ।
আসামি মো. পারভেজ (২৪), পেশায় অটোরিকশাচালক, নিহত কিশোরের প্রতিবেশী এবং তথাকথিত ‘বন্ধু’। কিন্তু সেই বন্ধুত্বই পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে।
জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, কিশোরটি নিয়মিত পারভেজের অটোরিকশায় করে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করত এবং বিনিময়ে দিত দ্বিগুণ ভাড়া।
শুরুতে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হলেও, একপর্যায়ে পারভেজ বুঝতে পারেন—এই যাতায়াতের আড়ালে চলছে ইয়াবা পাচার।
লোভ তখনই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কিশোরের কাছে ইয়াবা ব্যবসার লাভের অংশ দাবি করেন পারভেজ। কিন্তু কিশোর রাজি হয়নি। আর সেই অস্বীকৃতিই হয়ে ওঠে মৃত্যুর কারণ।
ঘটনার রাতে গ্রামে বন্ধুদের সঙ্গে ক্যারম খেলছিল কিশোর। সাকিব নামের এক তরুণকে দিয়ে তাকে ডেকে আনা হয় স্থানীয় একটি কলেজ মাঠে। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিল পারভেজসহ কয়েকজন।
প্রথমে ইয়াবা ও টাকা দাবি, এরপর ছিনতাই—কিশোরের পকেট থেকে টাকার বান্ডিলও কেড়ে নেওয়া হয়। তারপর শুরু হয় নির্যাতন।
মারধর করতে করতে তাকে একটি সেতুর ওপর নিয়ে যাওয়া হয়। হাত-পা চেপে ধরে রাখা অবস্থায় কিশোর বারবার অনুনয় করে—“আমার সব নিয়ে যাও, তবু প্রাণে বাঁচতে দাও।” কিন্তু ততক্ষণে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
হাসান নামের এক সহযোগী বলে ওঠে—“তাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না, বেঁচে থাকলে সব বলে দেবে।” এরপর ধারালো কোদাল দিয়ে কিশোরের পা ও গলায় একের পর এক আঘাত। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু। সূত্র-প্রথম আলো
নৃশংসতার এখানেই শেষ নয়। প্রমাণ মুছে ফেলতে কিশোরের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে দেহ ও মাথা আলাদা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
পরিচয় গোপন করতে মাথার চুল পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়। রক্তের দাগ মুছতে ঘটনাস্থলে পানি ঢালা হয়।
প্রায় তিন সপ্তাহ পর শিয়ালের দল মাটি খুঁড়ে দেহাংশ বের করে আনে। পোশাক দেখে পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেন কিশোরকে। তখনই প্রকাশ্যে আসে লুকানো হত্যার বিভীষিকা।
ঘটনার পর নিহতের বাবা মামলা করলেও দীর্ঘদিন তদন্তে অগ্রগতি হয়নি। পরে ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।
সিআইডির পরিদর্শক মোশারফ হোছাইনের নেতৃত্বে তদন্তে অবশেষে উঠে আসে পারভেজের নাম। গত বৃহস্পতিবার তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদে ভেঙে পড়ে সে।
শুক্রবার চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হারুনের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে আসে পুরো হত্যাকাণ্ডের শিহরণ জাগানো বিবরণ।
নিহতের বাবা বলেন—“পারভেজের গাড়িতে আমার ছেলে যেত। ভাবতেই পারিনি সেই মানুষই টাকার জন্য আমার ছেলেকে মেরে ফেলবে।” তার দাবি—এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সকল আসামির গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
সিআইডি জানিয়েছে, এটি ছিল একটি ‘ক্লুলেস’ মামলা। তবে অবশেষে রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি সমাজে ছড়িয়ে পড়া মাদক, লোভ এবং মানবিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।




