চট্টগ্রামের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বালুচরা কার্যালয় এখন যেন এক অঘোষিত দালালনির্ভর সেবা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সরকারি ফি জমা দিয়েও যেখানে সাধারণ মানুষ দিনের পর দিন ঘুরছেন, সেখানে বাড়তি টাকা দিলেই দালালের মাধ্যমে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সম্পন্ন হচ্ছে কাজ।
সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশেই গড়ে উঠেছে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিআরটিএ কার্যালয়ে কোনো মোটরসাইকেল বা গাড়ি প্রবেশ করামাত্রই কয়েকজন দালাল ছুটে গিয়ে চালকের কাগজপত্র সংগ্রহ করে নিচ্ছেন।
পরে নানা অজুহাতে কাজ আটকে রেখে সেবাপ্রার্থীদের দালালের কাছেই যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেবাপ্রার্থী বলেন, “নিজে কাজ করতে গেলে ফাইল ঘোরানো হয়। দালাল ধরলে দ্রুত কাজ হয়ে যায়। কর্মকর্তাদের একাংশ দালালদের সহযোগিতা করেন বলেই আমরা বাধ্য হই অতিরিক্ত টাকা দিতে।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদ। তিনি বিআরটিএর নম্বর প্লেট শাখার কর্মচারী শাকিলকে ‘ম্যানেজ’ করে নম্বর প্লেটসংক্রান্ত প্রায় সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। সেবাপ্রার্থীদের ভাষ্য, রাশেদের বাইরে গিয়ে নম্বর প্লেটের কাজ করানো প্রায় অসম্ভব।
অভিযোগ রয়েছে, গাড়ির নাম পরিবর্তনের কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন রাশেদের ছোট ভাই মাসুদ। আর গাড়ির ডকুমেন্টস–সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন হান্নান নামে আরেক দালাল। কার্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে তাদের অবাধ চলাফেরা এবং প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
সেবাপ্রার্থীরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত ফি জমা দিয়েও নির্ধারিত সময়ে কাজ না পাওয়ায় তারা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
অনেক মোটরসাইকেল ও গাড়িচালক প্রয়োজনীয় কাগজ হাতে না পাওয়ায় রাস্তায় পুলিশি হয়রানিরও শিকার হচ্ছেন। অথচ দালালের মাধ্যমে বাড়তি টাকা দিলে একই কাজ অল্প সময়েই সম্পন্ন হচ্ছে।
একাধিক ভুক্তভোগী জানান, দালালদের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি। বরং অভিযোগ করার পর সংশ্লিষ্টদের আচরণ আরও কঠোর হয়ে ওঠে। ফলে ভয়ে অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতেও চান না।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, একটি সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে কীভাবে বছরের পর বছর প্রকাশ্যে দালালচক্র সক্রিয় থাকে? কীভাবে অফিসের ভেতরে বসেই তারা কাজ নিয়ন্ত্রণ করে?
অভিযোগ উঠেছে, এই সিন্ডিকেটের পেছনে প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নীরব আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে বলেই দালালদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে বিআরটিএর লাইসেন্স শাখায় যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দালাল প্রসঙ্গে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে অফিসে এসে যোগাযোগ করতে বলে ফোন কেটে দেন।
অন্যদিকে বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাসুদ আলম–এর সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সরকারি সেবাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই দালালনির্ভর ব্যবস্থার অবসান চান ভুক্তভোগীরা।
তাদের দাবি, বিআরটিএতে স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে হলে আগে দালাল সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, আর এর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।




