একটি বিদেশি পিস্তল ও নয়টি গুলি উদ্ধারের মামলা। তদন্ত শেষে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে নাম এসেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তৎকালীন এস্টেট অফিসার মো. আলমগীর খানের।
আদালত সেই অভিযোগপত্র গ্রহণও করেছেন ২০১২ সালে। মামলায় আত্মসমর্পণের পর দুই মাসের বেশি সময় কারাগারেও ছিলেন তিনি। কিন্তু এত কিছুর পরও তাঁর সরকারি চাকরিতে যেন কোনো আঁচ পড়েনি।
সাময়িক বরখাস্ত হননি একদিনের জন্যও। নিয়মিত বেতন পেয়েছেন। বরং সময়ের ব্যবধানে ১১তম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে পদোন্নতিও পেয়েছেন। অথচ সংশ্লিষ্ট মামলা এখনো বিচারাধীন।
এখানেই মূল প্রশ্ন-একজন সরকারি কর্মকর্তা ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পর আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করলেও তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন?
ঘটনার সূত্রপাত ২০১১ সালে। কোতোয়ালী থানায় র্যাবের করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরের স্টেশন রোড এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর উদ্দেশ্যে একটি চক্র অবস্থান নিয়েছিল। র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
পরে ঘটনাস্থলে থাকা একটি গাড়ি তল্লাশি করে একটি বিদেশি পিস্তল ও নয় রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে র্যাব। গাড়িটির নম্বর ছিল চট্ট মেট্রো গ-১২-২২৬১। গাড়িটির মালিক হিসেবে সামনে আসে আলমগীর খানের নাম।
র্যাবের তৎকালীন ডিএডি মো. আব্দুল গাফফার গাড়ির নম্বর উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় এজাহার দায়ের করেন।
তদন্ত এগোতে থাকে। একই বছরের শেষ দিকে পুলিশ আলমগীর খানসহ অজ্ঞাতনামা আরও দুজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, এজাহারে উল্লেখিত গাড়ির মালিক আলমগীর খানসহ অজ্ঞাতনামা দুজনের বিরুদ্ধে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯-এর ‘এ’ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।
অজ্ঞাতনামা দুজনের ঠিকানা শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় তাঁদের বিষয়ে অগ্রগতি না হলেও আলমগীর খানের বিরুদ্ধে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনে চার্জ গঠনের সুপারিশ করা হয়। ২০১২ সালে আদালত ওই অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।
তারপরও সিডিএর প্রশাসনিক নথিতে এর প্রতিফলন কতটা হয়েছিল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-আলমগীর খানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেও পুলিশ তাঁকে পায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। অর্থাৎ মামলার একটি পর্যায়ে তিনি পুলিশের কাছে পলাতক ছিলেন।
পরে ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠান। দুই মাসের বেশি সময় কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সময়ের মধ্যে তাঁর সরকারি চাকরির অবস্থান কী ছিল?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি। চাকরিতে বহাল থেকেছেন এবং নিয়মিত বেতনও পেয়েছেন। এর মধ্যেই ১১তম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি।
ফলে একটি বিচারাধীন অস্ত্র মামলার অভিযুক্ত একজন সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আদৌ অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিই সামনে এসেছে।
সরকারি চাকরিতে থাকা কোনো কর্মকর্তা ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলে এবং আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গৃহীত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী হওয়া উচিত-এ প্রশ্নে চাকরিবিধির বিষয়টি সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিষদের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সেলিম চৌধুরীর ভাষ্য, কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করলে বা তিনি গ্রেপ্তার হলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সাময়িক বরখাস্তের মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে।
পরে বিচার শেষে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে খালাস বা অব্যাহতির ভিত্তিতে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে চাকরিতে পুনর্বহালের ব্যবস্থা হতে পারে।
এই বক্তব্যের আলোকে আলমগীর খানের ক্ষেত্রে সিডিএ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেটিই এখন যাচাইয়ের বিষয়।
প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক নথি, দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং পদোন্নতির প্রক্রিয়া নিয়েও।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সিবিএ সভাপতি ফয়েজ আহম্মদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ ধরনের একটি নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে।
তাঁর ভাষ্য, ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে বিষয়টি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলকে অবহিত করা হয়নি। ফলে ঘটনাটি দীর্ঘদিন আড়ালে থেকে গেছে।
এখন তাঁর প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট নথি বা ফাইল আদৌ সিডিএতে সংরক্ষিত আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
যদি সত্যিই কোনো ফৌজদারি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার পরও বিষয়টি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পৌঁছানো না হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কেবল একজন কর্মকর্তার চাকরির বিষয় নয়-এটি প্রশাসনিক জবাবদিহিরও প্রশ্ন।
অভিযোগ ও প্রশ্নের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) অর্থ ও প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্বক্ষণিক সদস্য (অতিরিক্ত সচিব) নুরুল্লাহ নূরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টিতে কোনো আইনগত জটিলতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) সহকারী সচিব ও সাবেক এস্টেট অফিসার মো. আলমগীর খানের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে প্রশ্নগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১১ সালে র্যাবের করা অস্ত্র মামলায় আলমগীর খানকে অভিযুক্ত করা হলো। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দিল।
২০১২ সালে আদালত সেই অভিযোগপত্র গ্রহণ করলেন। তিনি আত্মসমর্পণ করে দুই মাসের বেশি কারাগারে থাকলেন। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
তারপরও-কেন তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি? চার্জশিটের বিষয়টি সিডিএর প্রশাসনিক নথিতে কীভাবে বিবেচিত হয়েছিল? কার অনুমোদনে তিনি চাকরিতে বহাল ছিলেন? কারা তাঁর পদোন্নতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন? ১১তম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে পদোন্নতির সময় মামলাটির তথ্য কি কর্তৃপক্ষের সামনে ছিল?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-একজন কর্মকর্তা ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ও কারাভোগের পরও যদি তাঁর চাকরি, বেতন ও পদোন্নতিতে কোনো প্রশাসনিক বাধা না থাকে, তাহলে সিডিএর নিজস্ব জবাবদিহির কাঠামো তখন কোথায় ছিল?
মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। আলমগীর খান দোষী সাব্যস্তও হননি। তাই তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে-এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনিকভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, কিংবা আদৌ নেওয়া হয়েছিল কি না-এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই নথি ঘেঁটে বের করা সম্ভব।
সিডিএ বলছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এখন দেখার বিষয়, সেই যাচাই-বাছাই শুধু ফাইল দেখার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি ২০১১ সালের অস্ত্র মামলা থেকে ২০১২ সালের চার্জশিট, দুই মাসের বেশি কারাভোগ, চাকরিতে বহাল থাকা এবং পরবর্তী পদোন্নতি-পুরো ঘটনাপ্রবাহের প্রশাসনিক দায়ও নির্ধারণ করা হয়।




