বন্দরনগরী চট্টগ্রামে হৃদরোগ চিকিৎসায় নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম। অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীসহ বিভিন্ন বয়সের ২ হাজারেরও বেশি হৃদরোগীর এনজিওপ্লাস্টি/স্টেন্টিং (পিটিসিএ) চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে হাসপাতালটি।
একই সঙ্গে এখন পর্যন্ত ৬ হাজারেরও বেশি ক্যাথ প্রসিডিউর সম্পন্ন করে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসায় নিজেদের সক্ষমতারও জানান দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই সাফল্য উদযাপন এবং হৃদরোগ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬ উপলক্ষে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামে আয়োজন করা হয় প্রেস ইভেন্ট ও সচেতনতামূলক র্যালির।
এবারের বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ডোন্ট মিস অ্যা বিট’ সামনে রেখে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হৃদরোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এবং সময়মতো উন্নত কার্ডিয়াক সেবা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এভারকেয়ার হসপিটালস, বাংলাদেশ (ঢাকা ও চট্টগ্রাম)-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও ডা. রত্নদ্বীপ চাস্কার, বিনয় কউল, এভারকেয়ার হসপিটালস চট্টগ্রামের চিফ অপারেটিং অফিসার, এভারকেয়ার হসপিটালস চট্টগ্রামের মেডিকেল সার্ভিসেস বিভাগের ডিরেক্টর ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির, এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসাল্টেন্ট ও কো-অর্ডিনেটর প্রফেসর ডা. শেখ মোহাম্মদ হাছান মামুন, সিনিয়র কনসাল্টেন্ট ডা. জহির উদ্দিন মাহমুদ ইলিয়াছ, সিনিয়র কনসাল্টেন্ট ডা. মো: তারিক বিন আব্দুর রশিদ, অ্যাটেন্ডিং কনসাল্টেন্ট ডা. সমীর কুমার পাল, অ্যাটেন্ডিং কনসাল্টেন্ট ডা. রাকিব চৌধুরীসহ হাসপাতালের অন্যান্য চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ।
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের ২ হাজারেরও বেশি হৃদরোগীকে পিটিসিএ চিকিৎসাসেবা দিয়েছে। হৃদরোগের মতো জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দ্রুত সঠিক চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এভারকেয়ার চট্টগ্রাম ধারাবাহিকভাবে সেই চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে আসছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
একইসঙ্গে হাসপাতালটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এখন পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি ক্যাথ প্রসিডিউর সম্পন্ন হয়েছে। হৃদরোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় হাসপাতালের সক্ষমতা, অভিজ্ঞ চিকিৎসক দল এবং সমন্বিত চিকিৎসাসেবার বিভিন্ন দিক অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।
এভারকেয়ার হসপিটালস, বাংলাদেশ (ঢাকা ও চট্টগ্রাম)-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও ডা. রত্নদ্বীপ চাস্কার বলেন, দুই হাজারেরও বেশি রোগীকে সেবা দিতে পেরে আমরা গর্বিত। রোগীদের আস্থা ও আমাদের পুরো টিমের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এই অর্জনের মূল শক্তি। ভবিষ্যতেও আরও উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসাল্টেন্ট ও কো-অর্ডিনেটর প্রফেসর ডা. শেখ মোহাম্মদ হাছান মামুন বলেন, এখন পর্যন্ত ২ হাজারেরও বেশি রোগীকে সেবা দেওয়া আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি। রোগীরা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। এই পথচলায় আমাদের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। তাই তাদের আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই। ভবিষ্যতে আমরা আরও ভালো করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবো।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। সিনিয়র কনসাল্টেন্ট ডা. জহির উদ্দিন মাহমুদ ইলিয়াছ বলেন, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অনিয়মিত স্পন্দনের মতো উপসর্গ অবহেলা করা উচিৎ নয়। নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা গেলে জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, উচ্চ-রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, ধূমপানসহ বংশগত কারণেও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, ধূমপান বর্জন এবং পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে হার্ট সুস্থ রাখা সম্ভব। তাঁর মতে, সচেতনতা বাড়ানো গেলে হৃদরোগ প্রতিরোধ করা কঠিন কিছু নয়।
সিনিয়র কনসাল্টেন্ট ডা. মো: তারিক বিন আব্দুর রশিদ বলেন, “হৃদরোগ এখন কেবল বয়স্কদের সমস্যা নয়, যেকোনো বয়সেই এটি দেখা যাচ্ছে, যা ভীষণ উদ্বেগজনক। কিছু ক্ষেত্রে উপসর্গও বোঝা যায় না, আবার কিছু ক্ষেত্রে রোগী বা স্বজনরা তা অবহেলা করে যান। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো সর্বোত্তম।
তিনি আরও বলেন, যারা আগে থেকেই হৃদরোগের চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে ওষুধ চালিয়ে যাওয়া এবং নিয়মিত ফলো-আপ নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এভারকেয়ার হসপিটালস বাংলাদেশ-এর মেডিকেল সার্ভিসেস বিভাগের ডিরেক্টর ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির বলেন, এভারকেয়ার হসপিটালস বাংলাদেশ সবসময় চেষ্টা করে উন্নত ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা-সেবা নিশ্চিত করতে।
প্রতিটি মানুষ হার্টের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকুক এবং প্রয়োজনে সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করুক ও সুস্থ থাকুক-এটিই আমাদের কাম্য।
অ্যাটেন্ডিং কনসাল্টেন্ট ডা. সমীর কুমার পাল বলেন, অনেক রোগী চিকিৎসার পর কিছুটা ভালো অনুভব করলে ওষুধ বন্ধ করে দেন কিংবা ফলো-আপে আসেন না। এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, হৃদরোগের চিকিৎসা একবারের ব্যাপার নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া। পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করালেই সুস্থতা ধরে রাখা সম্ভব।
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময় নষ্ট না করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন অ্যাটেন্ডিং কনসাল্টেন্ট ডা. রাকিব চৌধুরী। তিনি বলেন, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ বুকে তীব্র চাপ বা ব্যথা শুরু হলে অনেকে ভাবেন একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। তবে সেটি বিপদ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সচেতন হতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের এসব পরামর্শের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানে উঠে আসে একটি অভিন্ন বার্তা=হৃদরোগের ক্ষেত্রে সচেতনতা, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দিনব্যাপী আয়োজনের শেষপর্বে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অংশগ্রহণে একটি সচেতনতামূলক র্যালি অনুষ্ঠিত হয়।
হৃদরোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো চিকিৎসাসেবা গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে র্যালিটি হাসপাতাল প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করে।
বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে আয়োজিত প্রেস ইভেন্ট ও র্যালির মধ্য দিয়ে এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম একদিকে যেমন ২ হাজারেরও বেশি হৃদরোগীর পিটিসিএ চিকিৎসা সম্পন্ন করার মাইলফলক উদযাপন করেছে, অন্যদিকে হৃদরোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় জনসচেতনতার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।




