চট্টগ্রামে জাল স্বাক্ষর ও ভুয়া ব্যক্তিগত গ্যারান্টিনামা ব্যবহার করে প্রায় ৩০ কোটি টাকার ব্যাংকঋণ নেওয়ার মামলায় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহ আলমকে বিভিন্ন ধারায় মোট ১৬ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
তবে সব ধারার সাজা একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় তাঁকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাভোগ করতে হবে।
একই সঙ্গে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে; অনাদায়ে ভোগ করতে হবে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. মিজানুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার সময় আসামি শাহ আলম আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানার পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, মোহাম্মদ শাহ আলম ও তাঁর ছেলে এস এম পারভেজ আলম ২০০৪ সালে তিন সহোদরের স্বাক্ষর জাল করে চারটি ভুয়া ব্যক্তিগত গ্যারান্টিনামা তৈরি করেন।
এসব নথিতে প্রত্যেকের নামে ২৫ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে দেখানো হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে ওই জাল নথি ব্যবহার করে ২০১২ সালে চট্টগ্রামের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা খাতুনগঞ্জে অবস্থিত প্রিমিয়ার ব্যাংকের একটি শাখা থেকে ঋণ সুবিধা নেন তাঁরা।
পাঁচটি এলটিআর (LTR) ও একটি সিসি (হাইপো) ঋণ সুবিধার বিপরীতে ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয় মোট ২৯ কোটি ৯৯ লাখ ৫৯ হাজার ২৮২ টাকা।
অর্থাৎ, জাল স্বাক্ষর ও ভুয়া গ্যারান্টিনামার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই মামলার মূল ঘটনা প্রায় ৩০ কোটি টাকার ব্যাংকঋণ।
মামলার নথিতে উল্লেখ করা হিসাব অনুযায়ী, উত্তোলন করা ঋণের বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছিল ৮ কোটি ৩২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৪৮ টাকা।
কিন্তু ২০১৪ সালের ১১ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, বকেয়া আসল, সুদ ও অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৯ কোটি ৬৮ লাখ ১৪ হাজার ৭১২ টাকা।
ঋণ উত্তোলন, আংশিক পরিশোধ এবং পরবর্তী সময়ে বকেয়া অর্থের পরিমাণ-সব মিলিয়ে ঘটনাটি ব্যাংকঋণ জালিয়াতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা হিসেবে আদালতে গড়ায়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মোকাররম হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, দীর্ঘ সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকঋণ গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
আদালত দণ্ডবিধির চারটি ধারায় আসামিকে কারাদণ্ড দেন। এর মধ্যে ৪২০ ধারায় তিন বছর, ৪৬৭ ধারায় পাঁচ বছর, ৪৬৮ ধারায় তিন বছর এবং ৪৭১ ধারায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড রয়েছে।
সব মিলিয়ে কারাদণ্ডের মেয়াদ ১৬ বছর হলেও সাজাগুলো একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাভোগ করতে হবে তাঁকে।
এ ছাড়া আদালত ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন। ওই অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থের ক্ষতি ও জালিয়াতির অভিযোগে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এর তৎকালীন সহকারী পরিচালক এইচ. এম. আখতারুজ্জামান বাদী হয়ে ২০১৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি নগরের কোতোয়ালী থানায় নিয়মিত মামলা করেন।
তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, সাক্ষ্যগ্রহণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে মঙ্গলবার রায় ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত।
মামলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো, রায় ঘোষণার সময় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহ আলম আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।




