ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (সিডিএ) শতাধিক জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, জালিয়াতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি চাকরি আইন, বিধি ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রবিধান উপেক্ষা করে ‘পছন্দের লোক’ নিয়োগ দিতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাজ করেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও পাস দেখানো, অস্তিত্বহীন পদে নিয়োগ, মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা প্রার্থীর চেয়ে বেশি নিয়োগ—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সিডিএ কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সিডিএর আর্থিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে ১১৫ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। অথচ নিয়োগ খাতে বাজেটে কোনো বরাদ্দই ছিল না।
নিয়োগপ্রার্থীদের জমা দেওয়া পে-অর্ডারের অর্থও নামে-বেনামে ব্যয়ের হিসাব দেখিয়ে আত্মসাতের চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রশ্নফাঁসকারীকে থানা হাজত থেকে গভীর রাতে মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়া, পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন দেখে উত্তর লেখার সুযোগ দেওয়া, একজন পরীক্ষার্থীর খাতা অন্যজন দিয়ে লেখানো এবং প্রকৃত মেধাবীদের বাদ দিয়ে স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কোনো কোনো পদে মৌখিক পরীক্ষায় দুজনকে ডেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে চারজনকে। আবার একটি পদে ১১ জনকে ভাইভায় ডেকে ১১ জনকেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এমনকি বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সনদ না থাকা সত্ত্বেও ইমারত পরিদর্শক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সিডিএর ভেতরেও। কর্মচারী ইউনিয়নের অভিযোগ, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ছিল ‘নিয়োগ বাণিজ্যের মহাযজ্ঞ’। তাই বিতর্কিত এই নিয়োগ সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র দেখিয়ে ৩১টি পদের বিপরীতে ১১৫ জন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
কিন্তু সহকারী স্থপতি, সহকারী প্রোগ্রামার, স্টাফ অফিসার, জনসংযোগ কর্মকর্তা, জিআইএস অপারেটর ও ইমারত পরিদর্শকসহ বেশ কয়েকটি পদ সিডিএর “চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্মচারী চাকুরী প্রবিধানমালা, ১৯৯০”-এর অনুমোদিত জনবল কাঠামোতেই নেই।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব পদ আইন অনুযায়ী তিন বছর ধরে নবায়ন ও সংরক্ষণ করা হয়নি।
এমনকি পদগুলো স্থায়ী করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। ফলে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা কীভাবে দেওয়া হবে, সে বিষয়েও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বিতর্কিত এই নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী সৈয়দ নুরুল করিম। সদস্যসচিব ছিলেন সিডিএ সচিব রবীন্দ্র চাকমা।
এদিকে একই সময়ে পদোন্নতি নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের আমলে সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের পুরস্কার হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি গ্রেডেশন তালিকায় স্বাক্ষরের আগেই পদোন্নতির আদেশ জারি করা হয়েছে, যা বিধিবহির্ভূত।
এসব অভিযোগ তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হলেও পরে “অনিবার্য কারণ” দেখিয়ে তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
এতে তদন্ত নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তদন্ত কমিটিকে ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে সিডিএর ভয়াবহ আর্থিক সংকটের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি কার্যত ঋণের বোঝায় জর্জরিত।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পেনশন তহবিলের ফিক্সড ডিপোজিট পাঁচ কোটি টাকা থেকে নেমে এসেছে ৫০ লাখ টাকায়। নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
আয়বর্ধক নতুন কোনো প্রকল্পও নেই। এমন অবস্থায় আরও ১১৫ জন নিয়োগকে ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রতিবাদ করলেই কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়।
দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “সিডিএতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে।
আদালতের আদেশ ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশও মানা হচ্ছে না। রহস্যজনক কারণে তদন্তও থেমে আছে। তাই বাধ্য হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছি।”
একই অভিযোগের অনুলিপি গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছেও পাঠানো হয়েছে।




