চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের এক শিশু কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয় চেয়ারম্যানঘাটা আবু জাফর রোড এলাকা।
বিক্ষুব্ধ জনতার তোপ, পুলিশের কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, অগ্নিসংযোগ—সব মিলিয়ে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত যুবকের নাম মনির। তিনি স্থানীয় একটি ডেকোরেশন দোকানে কাজ করেন। অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে এলাকা।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, টানা পাঁচ ঘণ্টা একটি ভবনে অবরুদ্ধ থাকার পর রাত ১০টার দিকে এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে কৌশলে অভিযুক্তকে বের করে আনে পুলিশ।
পরে তাঁকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার ভিড়ের মধ্য দিয়েই বাকলিয়া থানায় নেওয়া হয়। রাত একটার দিকেও থানা ঘিরে অবস্থান নিতে দেখা গেছে ক্ষুব্ধ জনতাকে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় চার বছর বয়সী এক শিশু হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। বিকেলে তাকে উদ্ধার করা হলে শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে স্বজন ও স্থানীয়দের সন্দেহ হয়, সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
খবরটি মুহূর্তেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিকেল পাঁচটার পর থেকেই শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁদের অভিযোগ, মনির নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন।
এরপর স্থানীয়রা অভিযুক্তের অবস্থান নিশ্চিত করে ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ নামের একটি ভবন ঘিরে ফেলেন। উত্তেজিত জনতা ভবনটির কলাপসিবল গেট ভেঙে ফেলারও চেষ্টা চালায়।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশুটিকে পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। অন্যদিকে অভিযুক্তকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে জনতা রাস্তা অবরোধ করে দাঁড়িয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় বিক্ষুব্ধ লোকজন চিৎকার করে বলতে থাকেন,“বাংলাদেশে বিচার নেই। ধর্ষককে আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরা মেরে ফেলব। তার বিচার আমরাই করবো।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।
সংঘর্ষ চলাকালে সংবাদ সংগ্রহ ও ফেসবুক লাইভ করতে গিয়ে পুলিশের ছোঁড়া সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে আহত হন চট্টগ্রাম প্রতিদিন-এর স্টাফ রিপোর্টার মামুন আবদুল্লাহ ও নোবেল হাসান।
জানা গেছে, নোবেল হাসানের হাত ও পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। মামুন আবদুল্লাহর কোমর ও পায়ে আঘাত লাগে।
আহত দুজনকে প্রথমে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ছাড়া সংঘর্ষে স্থানীয় কয়েকজন যুবকও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে।
রাত ১০টার পর হঠাৎ পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক সেই সময় ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ থেকে অভিযুক্তকে বের করে আনে পুলিশ।
পরে তাঁকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে জনতার চোখ ফাঁকি দিয়ে বাকলিয়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, “অভিযুক্তকে থানায় আনা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
অভিযুক্তকে থানায় নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয়রা। তাঁরা পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য মোতায়েন করা হয়।
রাত ১২টার দিকে ক্ষুব্ধ জনতার একটি দল থানা ঘেরাও করতে মূল সড়কে পৌঁছে যায়। কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বালানোর ঘটনাও ঘটে।
পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়েন আরও কয়েকজন সাংবাদিক। আজকের পত্রিকা-এর মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আব্দুল কাইয়ুমকে একটি কমিউনিটি সেন্টারের ছাদে বেশ কিছুক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
পরে তিনি ফেসবুকে আটকে থাকার কথা জানালে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। গভীর রাত পর্যন্ত পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে।




