ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পরও সক্রিয় সাজ্জাদ বাহিনী, চিন্তায় পুলিশ

অনলাইন ডেস্ক

চট্টগ্রামের অপরাধজগতের আলোচিত মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার হলেও স্বস্তি মেলেনি পুলিশের। বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এই ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর ধারণা করা হয়েছিল, চট্টগ্রামে এই বাহিনীর চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতা কমবে। তবে সম্প্রতি হামজারবাগে একটি ভবনের গেটে দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ার ঘটনায় সেই আশায় গুঁড়েবালি।

- Advertisement -

পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, নতুন এই হামলার পেছনেও সাজ্জাদ বাহিনীর হাত রয়েছে। ফলে একের পর এক সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার পরও বাহিনীটি কীভাবে সক্রিয় থাকছে, তা নিয়ে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কপালে।

- Advertisement -
google news follower

সবশেষ সোমবার (১০ আগস্ট) দিবাগত রাতে হামজারবাগের রুনা টাওয়ারে গুলি ছোড়ার আগে দুবাইপ্রবাসী এক ব্যবসায়ীর হোয়াটসঅ্যাপে বিদেশি নম্বর থেকে ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়। সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি পূরণের জন্য চাপ দেওয়া হয়। কথা না শুনলে লোক পাঠানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। এরপর বিদ্যুৎ না থাকার সুযোগে দুই যুবক ভবনের গেটে গিয়ে পিস্তল দিয়ে দুই রাউন্ড গুলি ছুড়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। বিদেশি নম্বর থেকে হুমকি, এরপর স্থানীয় অস্ত্রধারীদের দিয়ে গুলি—এই কৌশল সাজ্জাদ বাহিনীর আগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিল রয়েছে।

চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানান, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এ ঘটনা ঘটেছে। গত ২৯ জুলাই ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে সহযোগীসহ ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ইমনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

- Advertisement -
islamibank

ইমন গ্রেপ্তারের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, সাজ্জাদ বাহিনীর মাঠপর্যায়ের চাঁদাবাজি, অস্ত্রের মহড়া ও হামলার ঘটনা কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু হামজারবাগের গুলির ঘটনায় উল্টো নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একজন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী গ্রেপ্তার হওয়ার পরও কীভাবে একই কায়দায় হুমকি দিয়ে গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটছে? বিদেশে থাকা সাজ্জাদ কীভাবে তার বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন, কেন তার নেটওয়ার্ক ভাঙা যাচ্ছে না—এখন এসব প্রশ্নই সামনে এসেছে।

তবে কয়েক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার হলেও সাজ্জাদ বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রায়হান আলমসহ কয়েকজন এখনো অধরা। ইমনের অনুপস্থিতিতে মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকাণ্ড রায়হানের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। ফলে ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি রায়হানকে গ্রেপ্তার করাও এখন পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সাজ্জাদ বাহিনীর চাঁদাবাজির বেশিরভাগ ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী ও প্রবাসী চাঁদার টাকা দিয়ে বিষয়টি গোপন রাখেন। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও এ ধরনের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র অনেক সময় পৌঁছায় না। আগে তৎপরতা থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একেবারে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সাজ্জাদ বাহিনী। ওই বছরের ২৯ আগস্ট বায়েজিদ বোস্তামী থানার অনন্যা আবাসিক ও কুয়াইশ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে মো. আনিস ও মাসুদ কায়সার নামে দুই যুবককে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এর কয়েক সপ্তাহ পর ২১ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁও থানার অদূরপাড়া এলাকায় চায়ের দোকানে বসে থাকা ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন তাহসীনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে।

এরপর গত বছরের ২০ আগস্ট হাটহাজারীর উত্তর মেখল বড় দীঘির পাড় এলাকায় সুপার প্রপার্টিজ ও ইটভাটার মালিক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। এর ১৫ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে তার কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ডেভিড ইমনের নির্দেশনায় সন্ত্রাসীরা বাড়িটি লক্ষ্য করে ৮ থেকে ১০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এছাড়া গত ২ জানুয়ারি ও ২৯ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের মালিক মুজিবুর রহমানের বাসভবনে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে দুই দফা হামলা ও অস্ত্রের মহড়া চালানো হয়। ১৪ জুন পাঁচলাইশ এলাকায় চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলামের সরকারি কার্যালয়ে ঢুকে টেবিলের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র রেখে হুমকি এবং মোবাইল ফোনে চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে।

১৩ জুন নগরের বাকলিয়া এলাকায় ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনের মালিকের কাছে ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদার টাকা না পেয়ে ডেভিড ইমনের নির্দেশনায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ৩৫ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ ওঠে। এর এক মাস পর ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দীঘিরপাড় এলাকায় ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদা না পেয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় মামলা হলে সেখানে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়। সর্বশেষ ১০ আগস্ট রাতে মুরাদপুরের হামজারবাগ এলাকায় এক প্রবাসীর কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না পেয়ে তার বহুতল ভবন লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

হামজারবাগের ঘটনার পর সিএমপির উত্তর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোস্তফা স্বপন বলেছেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণসহ প্রযুক্তিগত তদন্ত চলছে। হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের অপরাধজগতের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ‘বড় সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত। নব্বইয়ের দশক থেকে চট্টগ্রামের অপরাধজগতে তার উত্থান। ২০০০ সালে চট্টগ্রামের আলোচিত এইট মার্ডার বা আট খুনের মামলায় তিনি আসামি ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে পলাতক রয়েছেন তিনি। তবে বিদেশে অবস্থান করেও নিজস্ব বাহিনীর মাধ্যমে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ ও হাটহাজারী এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।

জেএন/এমআর

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ