উত্তরপত্রে নম্বর বাড়িয়ে জিপিএ-৫, সাবেক সচিব নারায়ণ চন্দ্রনাথসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

অনলাইন ডেস্ক

একজন পরীক্ষার্থীর ফলাফল বদলাতে কতটা দূর যাওয়া হয়েছিল-তার একটি বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে।

- Advertisement -

সেখানে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব নারায়ণ চন্দ্রনাথের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের এইচএসসি পরীক্ষার ১৪টি উত্তরপত্রে ২ থেকে সর্বোচ্চ ২৪ নম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

- Advertisement -
google news follower

এই নম্বর বাড়ানোর পরই তাঁর ফলাফল ‘এ প্লাস’ বা জিপিএ-৫-এ উন্নীত হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

ঘটনার তদন্ত শেষে গত ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এস এম সফিউল আজম মুন্সী আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।

- Advertisement -
islamibank

এতে নারায়ণ চন্দ্রনাথ, শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান, সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুস্তফা কামরুল আখতার এবং নক্ষত্র দেবনাথকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ১১ জনকে।

অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিষয়টি কেবল একটি ফলাফল পরিবর্তনের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জব্দ করা উত্তরপত্র, নম্বর ফর্দ ও অন্যান্য নথি পরীক্ষা করে নম্বর পরিবর্তনের একটি ধারাবাহিক চিত্র পেয়েছে পুলিশ।

৩১ থেকে ৪১, ৭০ থেকে ৯০

তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নক্ষত্র দেবনাথের উত্তরপত্র ও নম্বর ফর্দের অসামঞ্জস্য। বাংলা প্রথম পত্রের রচনামূলক অংশে নক্ষত্র পেয়েছিলেন ৩১ নম্বর। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সেটি বাড়িয়ে ৪১ করা হয়। একই বিষয়ের নৈর্ব্যক্তিক অংশে পাওয়া ২৪ নম্বরের সঙ্গে আরও ২ নম্বর যোগ করা হয়।

ইংরেজি প্রথম পত্রে রচনামূলক অংশে পাওয়া ৭০ নম্বর বাড়িয়ে করা হয় ৯০। দ্বিতীয় পত্রে পাওয়া ৫৭ নম্বরের সঙ্গে ২৪ যোগ করে দেখানো হয় ৮১।

পদার্থবিজ্ঞানেও পাওয়া গেছে নম্বর বাড়ানোর তথ্য। প্রথম পত্রের রচনামূলক অংশে ৩৪ নম্বরের সঙ্গে আরও ৮ নম্বর যোগ করা হয়। দ্বিতীয় পত্রের নৈর্ব্যক্তিক অংশে ২০ নম্বর বাড়িয়ে ২২ করা হয়।

রসায়ন প্রথম পত্রের রচনামূলক অংশে পাওয়া ৩০ নম্বর বাড়িয়ে করা হয় ৪০। একই পত্রের নৈর্ব্যক্তিক অংশে ৩ নম্বর বাড়িয়ে ২৩ এবং দ্বিতীয় পত্রের নৈর্ব্যক্তিক অংশে পাওয়া ১৯ নম্বরের সঙ্গে আরও ৪ যোগ করে ২৩ দেখানো হয়।

জীববিজ্ঞান প্রথম পত্রের রচনামূলক অংশের নম্বরও ১০ বাড়িয়ে ৩৯ করা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিবর্তনটি বিচ্ছিন্ন কোনো একটি নম্বরে সীমাবদ্ধ ছিল না। একাধিক বিষয়ের একাধিক অংশে নম্বর বাড়ানোর তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

ফল বদলের পেছনে কারা?

পুলিশের অভিযোগ, এই ফল পরিবর্তনের ঘটনায় নারায়ণ চন্দ্রনাথ তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তাঁকে সহায়তা করেন শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, কিবরিয়া মাসুদ খান তখন অবসরকালীন ছুটিতে ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ফলাফল প্রস্তুতের কাজে তাঁকে যুক্ত করা হয়। এর বিনিময়ে তাঁকে দৈনিক ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, ফলাফল পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় কিবরিয়া মাসুদ খানের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। জব্দ করা উত্তরপত্র, নম্বর ফর্দ এবং অন্যান্য নথি বিশ্লেষণ করে নারায়ণ চন্দ্রনাথের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

সন্দেহের শুরু ফল প্রকাশের পর

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর। ওই দিন ২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফল প্রকাশের পর নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে।

এরপর নক্ষত্রের ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য কে বা কারা আবেদন করেন। বিষয়টি জানতে পেরে তাঁর মা বনশ্রী দেবনাথ পাঁচলাইশ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, এই জিডির পর ফলাফল নিয়ে সন্দেহ আরও জোরালো হয়।

একজন পরীক্ষার্থীর ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন, পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি এবং পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত-ঘটনাটি ধীরে ধীরে শিক্ষা বোর্ডের অভ্যন্তরীণ একটি অভিযোগ থেকে আনুষ্ঠানিক তদন্তের পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত, বদলি ও ওএসডি

অভিযোগের পর ২০২৪ সালের জুনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে।

এরপর একই বছরের ৯ জুলাই নারায়ণ চন্দ্রনাথকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে সরিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক করা হয়। পরে ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে ওএসডি করা হয়।

তদন্ত শেষে নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল বাতিল করা হয়।

ঘটনার পরবর্তী ধাপ ছিল ফৌজদারি মামলা।

মামলা থেকে অভিযোগপত্র

২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন সচিব অধ্যাপক ড. এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ পাঁচলাইশ থানায় নারায়ণ চন্দ্রনাথসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

মামলার আসামিরা হলেন-নারায়ণ চন্দ্রনাথ, নক্ষত্র দেবনাথ, কিবরিয়া মাসুদ খান এবং সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুস্তফা কামরুল আখতার।

এরপর তদন্ত এগিয়ে নিয়ে গত ১৮ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।

অভিযোগপত্রে চারজনকে আসামি এবং ১১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনসহ দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

কারাগার, এরপর জামিন

মামলার তদন্ত চলাকালে গত ১৭ জুন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে নারায়ণ চন্দ্রনাথকে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।

এখন অভিযোগপত্রের ওপর আদালতের পরবর্তী আদেশের অপেক্ষা।

তবে পুলিশের অভিযোগপত্রে যে তথ্য উঠে এসেছে, তার কেন্দ্রবিন্দু একটি প্রশ্ন-একজন পরীক্ষার্থীর ফলাফল জিপিএ-৫-এ উন্নীত করতে কি শিক্ষা বোর্ডের ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছিল?

উত্তরপত্রে পাওয়া নম্বর, নম্বর ফর্দে থাকা সংখ্যা এবং পরিবর্তিত ফলাফলের মধ্যে যে অসামঞ্জস্যের কথা পুলিশ বলছে, তার বিচারিক মূল্যায়ন এখন আদালতের হাতে।

আর সেই কারণেই এই মামলার গুরুত্ব শুধু একজন পরীক্ষার্থীর ফলাফল নিয়ে নয়।

প্রশ্ন উঠেছে, পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র ও ফলাফল তৈরির মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় কারা কীভাবে হস্তক্ষেপ করতে পেরেছিলেন, সেই ব্যবস্থার নিরাপত্তা কতটা কার্যকর ছিল এবং দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষমতা ব্যবহারের ওপর নজরদারি কতটা শক্তিশালী ছিল।

আদালত অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে পরবর্তী আদেশ দেবেন। বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে-অভিযোগপত্রে বর্ণিত নম্বর পরিবর্তন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সহযোগিতার অভিযোগ শেষ পর্যন্ত কতটা প্রমাণিত হয়।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ