চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ৩১টি পদে ১৯৫ জন কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে একের পর এক প্রশ্ন সামনে এসেছে।
অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির শুনানিতে হাজির হননি সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম ও সাবেক সচিব রবীন্দ্র চাকমা।
তবে তাঁরা লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব মিজ্ আম্বিয়া সুলতানা।
গত বৃহস্পতিবার সিডিএ ভবনে অনুষ্ঠিত শুনানিতে নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা সিডিএর প্রতিনিধিরা দিতে পারেননি বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়মনীতি অনুসরণ, প্রার্থী বাছাই, অপেক্ষমাণ তালিকা, পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় নিয়োগ কার্যক্রম চালানোর মতো একাধিক বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।
২০২৫ সালে শুরু হওয়া এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, উচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় নিয়োগ কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
এর পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ, প্রক্সি প্রার্থী, আবেদনপত্রে কাটাছেঁড়া এবং নিয়োগবিধি অনুসরণ না করার অভিযোগও ওঠে। এসব অভিযোগ তদন্তে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মিজ্ ফৌজিয়া খান, সদস্য উপসচিব মিজ তাসমিন ফারহানা এবং সদস্যসচিব মিজ্ আম্বিয়া সুলতানা শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন।
সিডিএর পক্ষে ছিলেন চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, সচিব নূর এ জান্নাত রুমী ও সহকারী সচিব মো. আলমগীর খান।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও অভিযোগকারী হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই একাধিক ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে।
তিনি বলেন, প্রবেশপত্রে পরীক্ষার তারিখ উল্লেখ না করা, পরীক্ষার আগের দিন প্রবেশপত্র সরবরাহ, অপেক্ষমাণ তালিকা ছাড়াই ৯ জনকে নিয়োগ এবং বিভিন্ন পরীক্ষায় ১:৫ অনুপাতে মৌখিক পরীক্ষার জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের নীতি অনুসরণ না করার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত কমিটির কাছে অপেক্ষমাণ তালিকা দেখতে চাওয়া হলেও সিডিএর কর্মকর্তারা তা দেখাতে পারেননি বলে দাবি করেন হাবিবুর রহমান।
তাঁর বক্তব্য, একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কারা মূল তালিকায় এবং কারা অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিলেন-তার নথি থাকা স্বাভাবিক। সেই তালিকা দেখাতে না পারার বিষয়টি নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এ ছাড়া পদোন্নতির গ্রেডেশন লিস্ট তৈরির আগেই সেটি বোর্ড সভায় অনুমোদন ও সুপারিশ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো-আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় নিয়োগ কার্যক্রম কেন এগিয়ে নেওয়া হলো।
হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, হাইকোর্টে মামলা বিচারাধীন থাকার পরও নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি জবাব চেয়েছে বলেও জানান তিনি।
অথচ ২০২৫ সালের ৩ জুলাই অনুষ্ঠিত সিডিএর ৪৬৫তম বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, মামলা নিষ্পত্তির পর আদালতের রায়ের আলোকে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
এই সিদ্ধান্তের পরও নিয়োগ কার্যক্রম কীভাবে এগোল, কার সিদ্ধান্তে এগোল এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে বোর্ডের সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না-এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হাবিবুর রহমানের দাবি, ৩১টি পদে ১১৫ জনের নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও পরবর্তী সময়ে ৯২ জনের নিয়োগপত্র জারি করা হয়। তাঁদের মধ্যে বর্তমানে ৭৫ জন কর্মরত।
এখানেও প্রশ্ন রয়েছে-বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষিত পদ, নির্বাচিত প্রার্থী, নিয়োগপত্রপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং বর্তমানে কর্মরত কর্মচারীর সংখ্যার মধ্যে এই পার্থক্যের কারণ কী? কোন পর্যায়ে কতজন বাদ পড়েছেন এবং তাঁদের বাদ দেওয়ার ভিত্তি কী ছিল-তার পূর্ণাঙ্গ নথি তদন্তে কতটা উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগকারীর দাবি, বাজেটে অর্থ বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন-ভাতা বাবদ রাজস্ব হিসাব থেকে ৭৩ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এই ব্যয়ের বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।
প্রক্সি, কাটাছেঁড়া আবেদন ও দুই সহকারী প্রকৌশলী
নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে আরও গুরুতর অভিযোগ করেছেন হাবিবুর রহমান। তাঁর দাবি, প্রক্সি দেওয়া প্রার্থী এবং কাটাছেঁড়া করা আবেদন বাতিল না করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দুই সহকারী প্রকৌশলীকে বিলম্বে নিয়োগপত্র দেওয়া এবং আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার বিষয়েও তদন্ত কমিটি জবাব চেয়েছে বলে জানান তিনি।
আরেক অভিযোগকারী ও নিয়োগপ্রার্থী মো. শাখাওয়াত হোসেনের অভিযোগ আরও সরাসরি। তিনি বলেন, নিয়োগে যে অনিয়ম হয়েছে এটা পানির মতো পরিষ্কার।
তাঁর দাবি, তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল করানো হয়েছে। খাতা দেখানোর আবেদন করেও তা দেখতে পারেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব মিজ্ আম্বিয়া সুলতানা বলেন, আমরা কারো পক্ষ নিয়ে কথা বলিনি। যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সত্য উৎঘাটনের চেষ্টা করেছি।
তিনি বলেন, তদন্তে কোনো গাফিলতি হবে না এবং সঠিক প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম ও সাবেক সচিব রবীন্দ্র চাকমা শুনানিতে উপস্থিত না থাকলেও তাঁরা লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ৩১টি পদে ১১৫ জন কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।




