যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই গত পাঁচ বছরে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত মেরিনড্রাইভ সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্টসহ পর্যটকনির্ভর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ২৫০টি রিসোর্ট নির্মাণে কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মেরিনড্রাইভ এলাকায় তারকামানের মাত্র ২০ থেকে ২৫টি স্থাপনার নকশা কউকের অনুমোদন পেয়েছে।
নিজেদের বিজ্ঞাপনে ‘এ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড ইন বাংলাদেশি হসপিটালিটি’ অর্থাৎ বাংলাদেশের আতিথেয়তায় বিশ্বমানের সেবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করতে পারেনি মেরিনড্রাইভের পাশে উখিয়ার ইনানীতে অবস্থিত টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্ট।
গত ১৭ অক্টোবর (শনিবার) ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের প্রাণহানির পর জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি শুধু ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। এর নকশার ক্ষেত্রে কউকের অনুমোদন ছিল না। গত জুনে ফায়ার সার্ভিস নোটিশ দিলেও প্রতিষ্ঠানটি তা আমলে নেয়নি।
টুপটুপ রিসোর্টের দুই প্রান্তে মেরিনড্রাইভের উখিয়া অংশে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় পর্যটকদের বাণিজ্যিক সেবা দেওয়া ২৪টি প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে।
সেগুলো হলো— সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, বে ওয়াচ, সাগরলতা রিসোর্ট, বেলাভূমি রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলা, দ্য ওয়েভ রিসোর্টস লিমিটেড, হোটেল ইনানী লং বে, ইনানী রয়্যাল রিসোর্ট, ইনানী বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, ডেরা রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, সেইলর বিচ রিট্রিট, টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্ট, পেবল স্টোন রিসোর্ট, অ্যান্ড্রোমিডা হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, ভিলা পাংকৌড়ি, রোয়াং ভেদা কোস্টাল রেসিডেন্স, ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, লা বেলা রিসোর্ট, অ্যাঙ্কর ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, ওশান নিয়ন রিসোর্ট, রয়্যাল টিউলিপ সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, বেলাভূমি বিচ ভিলা, আভা বিচ রিসোর্ট, বিচ প্যারাডাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, সি আইল্যান্ড হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ও নিউ ভিশন ইনানী। এর মধ্যে অন্তত ১৪টি প্রতিষ্ঠান নিজেদের ইকো বা পরিবেশবান্ধব দাবি করে ব্যবসা চালাচ্ছে।
প্রথমে রেস্টুরেন্ট, পরে রিসোর্ট
২০০৯ সালে পাটুয়ারটেক এলাকায় ‘কোরাল স্টেশন’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট ছোট পরিসরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। পরে সেখানে সি মাউন্ট, ওশান কিচেনসহ বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট চালু হয়।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক চেইন হোটেল রয়্যাল টিউলিপের মাধ্যমে সি পার্ল হোটেল প্রতিষ্ঠা পায়। এরপর থেকেই মূলত এখানে রিসোর্ট তৈরির প্রবণতা বাড়তে শুরু করে।
টুপটুপ রিসোর্টের জায়গায় ২০২৩ সালে প্রথমে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু হয়। পরে মালিক তানভীর মিয়া ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদকে সঙ্গে নিয়ে রেস্টুরেন্টটিকে রিসোর্টে রূপান্তর করেন। একইভাবে স্যালমন রেস্টুরেন্টের পেছনে বেলাভূমি রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলা এবং ওশান কিচেনের পাশে অ্যাঙ্কর রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এভাবে প্রায় ৯-১০টি প্রতিষ্ঠান রেস্টুরেন্ট থেকে আবাসিক সেবায় উন্নীত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা খাইরুল আমিন বলেন, বছর দশেক আগে এখানে রেস্টুরেন্টই বেশি ছিল। এখন সেগুলোর পরিসর বেড়েছে। পুরোনো রেস্টুরেন্টগুলো একেকটি রিসোর্ট-হোটেলে পরিণত হয়েছে।
সৈকত দখল করে ব্যবসা
সোনারপাড়া রিসোর্টের সামনে, সড়কের বিপরীত পাশে সৈকত অংশে সম্প্রতি গড়ে উঠেছে ‘ঝাউবাগান বিচ রেস্টুরেন্ট’। বালিয়াড়িতে, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) গড়ে ওঠা এই স্থাপনার কোনো অনুমোদন নেই।
উখিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতিষ্ঠানটি উচ্ছেদে অভিযান চালালেও কোনো অজ্ঞাত কারণে এটি অনুমোদন ও ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই এখনো ব্যবসা চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেস্টুরেন্টের পরিচালক মনির বলেন, কাগজপত্র থাকায় এসিল্যান্ড উচ্ছেদ করেননি। আমরা ফায়ার সার্ভিস ও কউকের অনুমোদন চেয়েছি। আশা করছি, সেগুলো পেয়ে যাব।
প্রতিষ্ঠানটির ৫০০ মিটারের মধ্যে সৈকতের বালিয়াড়িতে ‘সাদাবালি’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি রিসোর্ট চালাচ্ছে। সৈকত দখল করে নির্মিত এই রিসোর্টেরও অনুমোদন নেই।
সরেজমিনে গেলে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মী বলেন, স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী রিসোর্টটি বানিয়েছেন। তারাও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন।
সৈকত দখল করে শুধু রেস্টুরেন্ট-রিসোর্ট নির্মাণই নয়, কিটকট চেয়ার বসিয়ে সৈকত অংশে নিজেদের ব্র্যান্ডিং করে ব্যবসা চালাতেও দেখা গেছে অনেক প্রতিষ্ঠানকে। বিশেষ করে পালংকি, পেবল স্টোন, বে ওয়াচ, সি পার্লসহ ১০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের এমন কার্যক্রম সরেজমিনে দেখা গেছে।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, সমিতির তালিকাভুক্ত অধিকাংশ হোটেলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে। তবে জেলার বেশিরভাগ রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নেই। সৈকত দখল করে নির্মাণের মতো আইনবহির্ভূত কাজ করা এবং নিয়মনীতি না মানায় এসব প্রতিষ্ঠানকে সমিতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন জানান, গত এক বছরে ৫৮টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও কটেজকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে ইসিএ এলাকায় অবস্থিত শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করা হয়েছে।
সমন্বিত তৎপরতায় ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন
কউক, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়ে অবৈধ রিসোর্টের বিরুদ্ধে চলতি সপ্তাহেই অভিযান চালাতে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হোটেলগুলোর মালিকদের বৈধতা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশন, কউক ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হবে।
কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসীম উদ্দীন জানান, অনুমোদনহীন হোটেলগুলোর কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জনবলসংকটের কারণে সময়মতো অভিযান চালানো সম্ভব না হলেও তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অধিকার ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, পর্যটনশিল্প ও কক্সবাজারের সার্বিক বিকাশের স্বার্থে মেরিনড্রাইভের অব্যবস্থাপনা দূর করার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। সৈকত বাঁচলে পর্যটন বাঁচবে। পরিবেশ ও পর্যটন—দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
জেএন/এমআর




