রাষ্ট্রের একটি অতি সংবেদনশীল জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ ‘ডিসি’ বা জেলা প্রশাসক পদটি বাগিয়ে নিতে সরাসরি টাকার বিনিময়ে লিখিত স্ট্যাম্প চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের উপসচিব ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) কন্ট্রোলার অব স্টোর্স মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ (পরিচিতি নম্বর: ১৬৫২১)।
একটি ক্ষমতাধর তদবির সিন্ডিকেটের মাধ্যম তৈরি করা এই চুক্তিতে প্রাথমিক দরদাম নির্ধারণ করা হয় ৩০ কোটি টাকা। তবে পদায়ন নিশ্চিতের পর সার্ভিস চার্জ ও অতিরিক্ত মুনাফাসহ মোট ৬৯ কোটি টাকা ১৮ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের লিখিত অঙ্গীকার করেছেন এই সরকারি কর্মকর্তা।
সরকারি চাকরির বিধিমালা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নূন্যতম নীতি-নৈতিকতার সব সীমা অতিক্রম করে ক্ষমতার শীর্ষ আসন কেনাবেচার এই ভয়ংকর দলিল ফাঁস হয়ে পড়ায় গোটা প্রশাসন পাড়াজুড়ে তীব্র ধিক্কার ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
চার কোটিতে বন্দর, এবার ঘুষের কিস্তিতে ডিসির চেয়ার কেনাবেচার ভয়ংকর দলিল
প্রাপ্ত নথি ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পদায়নের নামে সালাহউদ্দিন আহমেদের অবিশ্বাস্য আর্থিক লেনদেনের ছক। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় পদায়ন পেতে আগেই এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চার কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব থাকাকালে গত বছরের ২৪ নভেম্বর ঢাকার ব্যবসায়ী আহমেদ শাকিল খানের সঙ্গে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে এই সংক্রান্ত একটি বাণিজ্যিক চুক্তি করেন তিনি।সূত্র-যুগান্তর
ব্যবসায়িক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নেওয়া চার কোটি টাকার জামানত হিসেবে তিনি তাঁর নিজ নামীয় সিটি ব্যাংকের দুটি অ্যাকাউন্টের চার কোটি টাকার চেক এবং নিজের স্ত্রী লায়লা হাবিবা ও বোন জিনিয়াত খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্রও জিম্মাদার হিসেবে ওই ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেন।
উক্ত অর্থ লেনদেনের এক মাসের মাথায়, ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাঁকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘পরিচালক’ পদে বদলি করা হয়। সালাহউদ্দিন আহমেদ এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পরবর্তীতে কোনো পদ খালি না থাকায় চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি তাঁকে ‘কন্ট্রোলার অব স্টোর্স’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে কাঙ্ক্ষিত একক কর্তৃত্বপূর্ণ পদ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ সালাহউদ্দিন আহমেদ অজ্ঞাত এক ব্যক্তির হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটিংয়ে নিজের হতাশা উগরে দিয়ে লেখেন, আমাকে দেওয়ার কথা ছিল এক পদ। ডিমোশন দিয়ে বসিয়েছে আরেক জায়গায়-আমি এখন নিঃস্ব।
এই ‘নিঃস্ব’ অবস্থা কাটাতে এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রক হতে তিনি আরও বড় বাজি ধরেন। চলতি বছরের ২৯ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক পদে পদায়নের আগাম লিখিত সম্মতি প্রকাশ করার পর ১৫ জুন তিনি একটি লিখিত ঋণ ও পদায়ন চুক্তিতে সই করেন।
ওই চুক্তিতে বাউফল উপজেলার বগা বন্দর এলাকার বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান নামে এক সাধারণ ব্যবসায়ীকে নিজের ‘অনুমোদিত প্রতিনিধি’ নিয়োগ দেন এই কর্মকর্তা, যাতে তিনি প্রশাসনের নীতি-নির্ধারণী মহলে দরকষাকষি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন।
প্রশাসনের বুকে নজিরবিহীন ‘আর্থিক দেউলিয়াত্ব’
একজন প্রথম শ্রেণির ক্যাডার কর্মকর্তা কীভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ চেয়ারকে বাজারদরের মতো কেনাবেচার বস্তুতে পরিণত করলেন, তা নিয়ে বিস্মিত আইন ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কোনো জেলা প্রশাসক পদের জন্য এভাবে লিখিত স্ট্যাম্পে কোটি কোটি টাকার চুক্তিপত্র সম্পাদন এবং জামানত হিসেবে ব্যাংক চেক হস্তান্তরের নজির বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
আইনবিদদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর ১১ নম্বর বিধি ও ১৯৯৭-এর ৩০ নম্বর বিধির সরাসরি লঙ্ঘন। একইসঙ্গে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী এটি চরম অসদাচরণ, যার একমাত্র আইনগত পরিণতি স্থায়ী বরখাস্ত।
এছাড়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগ এবং ঘুষের উদ্দেশ্যে কোটি কোটি টাকার অবৈধ চুক্তি ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭’ এবং ‘দণ্ডবিধি, ১৮৬০’-এর ১৬১ ও ১৬৫ ধারায় সরাসরি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
চবক উপসচিব সালাহউদ্দিনের ভয়ংকর রাজত্ব
অভিযোগ উঠেছে, এই মেগা দুর্নীতি ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা তৈরি হলে তা ধামাচাপা দিতেও সালাহউদ্দিন আহমেদ অনৈতিক পথ বেছে নেন।
সম্প্রতি জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকার চট্টগ্রাম কার্যালয়ে বসে সব সাংবাদিকদের বড় অঙ্কের টাকায় প্রভাবিত বা ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টার বিষয় প্রকাশ পাওয়ার পর বন্দর ভবনে তুমুল তোলপাড় শুরু হয়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে অভিযুক্ত কর্মকর্তা অফিসে অনুপস্থিত রয়েছেন এবং সহকর্মীদের ফোন রিসিভ করা বন্ধ রেখেছেন।
যদিও প্রাথমিক যোগাযোগের সময় সালাহউদ্দিন আহমেদ স্ট্যাম্পের স্বাক্ষর এবং সিটি ব্যাংকের চেক দুটি তাঁর নিজের বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন।
তাঁর দাবি, প্রতিপক্ষরা সেগুলোকে ‘জালিয়াতি’ করে উপস্থাপন করছে এবং তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি এটিকে তাঁর ‘ভুল’ বলে অভিহিত করেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সচিবের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমকে প্রধান করে এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ঘটনার সত্যতা জানতে সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রশাসনিক সচেতন মহল মনে করছে, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো সংবেদনশীল স্থাপনায় অবস্থান করে সালাহউদ্দিন আহমেদ যে জাল বিস্তার করেছেন, তা কেবল বিভাগীয় তদন্তের বিষয় নয়।
স্বাধীন তদন্ত সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে এই ভয়ংকর আর্থিক নেটওয়ার্ক ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এখনই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এই ঘটনাকে প্রশাসনিক পেশাদারিত্বের চরম অবমাননা হিসেবে দেখছেন। সরকারি পদ বিক্রির এই ভয়ংকর সিন্ডিকেট এবং এতে জড়িত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
তবে এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল বা চূড়ান্ত বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি। কারো বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তীতে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
ফাঁস হওয়া চুক্তিপত্র/সম্মতিপত্রের হুবহু অনুলিপি
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”
সম্মতিপত্র
তারিখঃ ১৫/০৬/২০২৬
আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী এই মর্মে প্রত্যয়ন করিতেছি যে, আমি সালাহউদ্দিন আহম্মেদ, উপসচিব, (পরিচিতি নং- ১৬৫২১) পরিচালক, চট্টগ্রাম বন্দর, পিতাঃ জারজিস আলী মাতা: বেগম সামসুন্নাহার, ঠিকানাঃ গ্রাম তালাইমারী পূর্বাংশ, পোস্ট কাজলা-৬২০৪, মতিহার, রাজশাহী, জাতীয় পরিচয়পত্র নং- ৩২৫১৩৩৬৭৫০, জাতীয়তাঃ বাংলাদেশী, ধর্মঃ ইসলাম, পেশাঃ চাকুরী। আপনার প্রতিষ্ঠান হতে অদ্য ১৫/০৬/২০২৬ ইং তারিখে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ৬০ (ষাট কোটি) টাকা ঋণ নিতে চায়, যাহার ৪০% সার্ভিস চার্জ ২৪ (চুরাশি কোটি) টাকা সহ মোট ৮৪ (চুরাশি কোটি) টাকা গ্রহণ করিবো যাহার দ্বিগুন মোট ১৬৮(একশত আটশটি) টাকা কাজের মাধ্যমে ১৮ (আঠারো) মাসের মধ্যে উনের বোন ঋণ চুক্তি পত্র স্থাপনের সময় প্রদানের অন্দীকার করলাম, যা ঋণ চুক্তিপত্রের মেয়াদ এর সময়ের চুক্তিপত্রে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে আমি সমুদয় অর্থ পরিশোধ এর ব্যাপারে ঋণ প্রদানকারী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করিবো এবং প্রয়োজনীয় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করিবো। কাজের বিনিময়ে যথা সময়ে পরিশোধের সম্মতি প্রদান করলাম। উল্লেখ্য যে, ঋণ চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের সময় প্রদানের অঙ্গিকার করিলাম। যা ঋণ চুক্তিপত্রের মেয়াদের সময়ের মধ্যে আপনার প্রতিষ্ঠানের সুবিধা মতো কাজের মাধ্যমে পরিশোধ করিব। আমি আরো প্রত্যয়ন করছি যে, ঋণ চুক্তিপত্রে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে আমি সমুদয় অর্থ পরিশোধের ব্যাপারে ঋণ প্রদানকারী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগীতা করিব এবং প্রয়োজনীয় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করিব।




