ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ, বিদগ্ধ আলেম এবং সুফি দর্শনের প্রবাদপুরুষ খলিফায়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী ‘হযরত মাওলানা সৈয়দ বজলুল করিম মন্দাকিনী (রহ.)’-এর বর্ণাঢ্য জীবন ও রচনাবলি নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক ব্যতিক্রমী ও জ্ঞানগর্ভ সেমিনার।
বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর ৩৮তম ২৬ আশ্বিন উরস শরিফ উপলক্ষে ‘এস জেড এইচ এম ট্রাস্ট’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ৭ দিনব্যাপী কর্মসূচির ২য় দিনে ৩ অক্টোবর (শনিবার) চট্টগ্রাম ক্লাবের ‘জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হল’-এ এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, তৎকালীন বিখ্যাত কলিকাতা আলিয়া মাদরাসা থেকে তৎকালীন সময়ের সর্বোচ্চ সনদ অর্জন করা মাওলানা সৈয়দ বজলুল করিম মন্দাকিনী (রহ.) ছিলেন একাধারে বিদগ্ধ আলেম এবং অন্যধারে শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের রাজপথের সৈনিক।
তিনি শুধু ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সরাসরি অংশই নেননি, বরং তাঁর রচিত কালজয়ী গীতি-কবিতার মাধ্যমে জনমানুষের ভেতরে জাগিয়ে তুলেছিলেন মুক্তির চেতনা।
তাছাড়া মুনাজারা ও ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’-এর মতাদর্শের অনন্যতা রক্ষায় তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখে গেছেন।
সেমিনারে আইনজীবী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.ফিল গবেষক অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইকবাল খলিফায়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী ‘হযরত মাওলানা সৈয়দ বজলুল করিম মন্দাকিনী (রহ.)’র রচনায় সুফিবাদ ও মাইজভাণ্ডারী দর্শন” শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
প্রবন্ধের ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুফ্তি মুহাম্মদ নুর হোসাইন বলেন, পবিত্র কুরআনুল কারিমের সূরা আলে ইমরানের ৬৪ নম্বর আয়াতে ‘পারস্পরিক সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়গুলো’র ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সম্প্রীতিময় সমাজ বজায় রাখতে এই শিক্ষার বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
একই ধারায় আলোচনায় ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে অবস্থিত ‘ফিনিস একাডেমি’র রিসার্চ ফেলো ড. সেলিম জাহাঙ্গীর বলেন, ধর্ম, মানবজীবন ও আধ্যাত্মিক দর্শন বোঝার ক্ষেত্রে মাইজভাণ্ডারী গান কেবল বিনোদন নয়, বরং গবেষণার এক বৈশ্বিক ও অনন্য উপকরণ।
এস জেড এইচ এম ট্রাস্টের সচিব অধ্যাপক এ ওয়াই এমডি জাফর এর সভাপতিত্বে সেমিনারে সভাপতি তাঁর বক্তব্যে আলোকপাত করেন মাইজভাণ্ডারী গানের অন্তর্নিহিত শক্তির ওপর।
তিনি বলেন, হুজুর গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী শাহ্ সুফি হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ (ক.) তাঁর ত্বরিকায় মাইজভাণ্ডারী গানের অনুমোদনের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে ইসলামকে কায়েম করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন।
আর মাওলানা সৈয়দ বজলুল করিম মন্দাকিনী (রহ.) সেই সুর ও গানের মাধ্যমেই ইসলামের আধ্যাত্মিক মর্মবাণী মানুষের অন্তর্জগতে সফলভাবে পৌঁছে দিয়েছেন।”
এস জেড এইচ এম ট্রাস্টের উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জসীমউদ্দিন সেমিনারে ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও সম্মানিত অতিথি হিসেবে ছিলেন প্রকৌশলী আজিজুর রহমান, বিশেষ অতিথি হিসেবে কুমিল্লা মুরাদনগর এম আরিফ কলেজের অধ্যাপক সৈয়দা রীনা আকতার এবং আবৃত্তি শিল্পী ও ব্যাংকার মোহাম্মদ জুনাইদ শাওকী।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন হযরত মাওলানা সৈয়দ বজলুল করিম মন্দাকিনী (রহ.)-এর পরিবারের সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী এবং এস জেড এইচ এম ট্রাস্ট ও মাইজভাণ্ডারী একাডেমির সম্মানিত কর্মকর্তা ও সদস্যবৃন্দ।
ট্রাস্টভুক্ত যুব প্রতিষ্ঠান ‘তাজকিয়া’র প্রাক্তন সভাপতি ও মাইজভাণ্ডারী একাডেমির সদস্য আরেফিন রিয়াদ-এর প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় সেমিনারে সূ সূচনা হয় মহাগ্রন্থ আল-কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে।
তিলাওয়াত করেন মাদরাসা-ই-গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর শিক্ষার্থী হাফেজ সৈয়দ মাহামুদুল হাসনাইন মাহাদী।
এরপর নাতে রাসূল (দ.) ও শানে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী পরিবেশন করেন প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আরমান উদ্দিন।
আলোচনা পর্বের সমাপ্তিতে নেমে আসে এক সুরময় আধ্যাত্মিক আবহ। মাইজভাণ্ডারী মরমী গোষ্ঠীর শিল্পীরা পরিবেশন করেন মনমুগ্ধকর মাইজভাণ্ডারী গান ও কাওয়ালী।
সবশেষে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সুখ-শান্তি, সার্বিক কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দরুদ, সালাম ও মোনাজাত পরিচালনা করেন গাউসিয়া কলন্দরিয়া নঈমিয়া দাখিল মাদরাসার সুপার মাওলানা আবদুর রহমান।




