সাত মালিককে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, চার ভবন সিলগালা

ইচ্ছেমতো ভবন’ নির্মাণে আর ছাড় নয়: চউকের কড়া বার্তা

ছয়টি ভবনের অবৈধ অংশ অপসারণ

অনলাইন ডেস্ক

একদিনেই ১৫ ভবনে অভিযান, সাত মালিককে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, চার ভবন সিলগালা।

- Advertisement -

চউকের দাবি—নগরের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভবন নির্মাণে মানা হয়নি অনুমোদিত নকশা ও বিল্ডিং কোড; ভবন মালিকদের পাল্টা অভিযোগ, সময়মতো তদারকি করেনি কর্তৃপক্ষ।

- Advertisement -
google news follower

চট্টগ্রাম নগরীর পরিকল্পিত উন্নয়নের অন্যতম শর্ত ছিল অনুমোদিত নকশা ও বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ। কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বছরের পর বছর নিয়ম লঙ্ঘন করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগের পর এবার কঠোর অবস্থানে নেমেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)।

- Advertisement -
islamibank

একদিনের অভিযানে নগরের বিভিন্ন এলাকায় নকশাবহির্ভূত ও অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সাত ভবনের মালিককে মোট ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

একই সঙ্গে চারটি ভবন সিলগালা করা হয়েছে এবং কয়েকটি ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দিনব্যাপী পরিচালিত এ অভিযানে নগরের মোট ১৫টি ভবন পরিদর্শন করা হয়। চউক বলছে, এসব ভবনের অধিকাংশেই অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন, বাধ্যতামূলক সেটব্যাক না রাখা, সড়ক ও নালার নির্ধারিত দূরত্ব অমান্য করা কিংবা অনুমোদনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণের মতো গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে।

অভিযানের শুরু হয় বাকলিয়া থানার কল্পলোক আবাসিক এলাকায়। সেখানে নির্মাণাধীন কয়েকটি ভবন পরিদর্শন করে দেখা যায়, একাধিক ভবনে বাধ্যতামূলক খালি জায়গা রাখা হয়নি, অনুমোদিত নকশা থেকে বিচ্যুতি ঘটানো হয়েছে এবং নির্মাণবিধি মানা হয়নি।

এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় চার ভবনের মালিককে মোট ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে একটি ভবন সিলগালা করা হয়।

অভিযানের সময় ওই এলাকায় ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা কয়েকটি অবৈধ দোকান মালিকদের নিজ উদ্যোগেই সরিয়ে নিতে দেখা যায়।

পরে কে বি আমান আলী রোড এলাকায় অভিযান চালিয়ে সড়ক দখল করে এবং প্রয়োজনীয় সেটব্যাক না রেখে ভবন নির্মাণের দায়ে এক ভবন মালিককে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

একই দিনে মোহরা এলাকায় পরিচালিত অভিযানে অনুমোদিত নকশা ছাড়া ভবন নির্মাণের অভিযোগে একটি ভবন সিলগালা করা হয়।

পাশাপাশি নকশাবহির্ভূত নির্মাণের দায়ে দুই ভবনের মালিককে মোট ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এরপর কাপ্তাই রাস্তার মাথায় অবস্থিত ক্যাফে আল মক্কা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ভবনে অভিযান চালিয়ে দেখা যায়, ভবনটি চউকের অনুমোদিত নকশা ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে ভবনটি সিলগালা করা হয়।

একই অভিযানে ১৪ তলা কাজী টুইন টাওয়ার ভবনের মালিকপক্ষ অনুমোদিত নকশা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হওয়ায় ভবনটিও সিলগালা করা হয়।

চউকের অভিযানে শুধু জরিমানা বা সিলগালাই নয়, কল্পলোক আবাসিক এলাকায় অন্তত ছয়টি বহুতল ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলা হয়। অভিযানের সময় বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সেবা সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়।

চউক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব অনিয়ম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তাদের দাবি, চট্টগ্রামে ভবন মালিকদের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই অনুমোদিত প্ল্যান ও বিল্ডিং কোড পুরোপুরি অনুসরণ করেন না।

নকশা অনুমোদনের পর অনেকেই ভবনের চারপাশের নির্ধারিত খালি জায়গা দখল করেন, সড়ক কিংবা নালার প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখেন না। কেউ কেউ অনুমোদনের অতিরিক্ত তলাও নির্মাণ করেন।

একাধিকবার সতর্ক করার পরও অনেক ভবন মালিক নিয়ম মানছেন না বলেও দাবি তাদের।

তবে অভিযানের মধ্যেই সামনে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন—এই অনিয়মগুলো বছরের পর বছর চলল কীভাবে?

অভিযানের সময় একাধিক ভবন মালিক অভিযোগ করেন, ভবন নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়ায় নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব চউকের। কিন্তু বাস্তবে নির্মাণকাজ চলাকালে কর্তৃপক্ষের নজরদারি ছিল না বললেই চলে।

সময়মতো পরিদর্শন করা হলে অনেক অনিয়ম শুরুতেই থামানো সম্ভব হতো। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন তদারকির ঘাটতির সুযোগেই অনেক ভবন নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মিত হয়েছে।

এই দুই বিপরীত অবস্থানই নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়টি সামনে এনে দিয়েছে।

একদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে, ভবন মালিকরা সচেতনভাবেই নিয়ম ভঙ্গ করছেন। অন্যদিকে ভবন মালিকদের একটি অংশের দাবি, নিয়মিত নজরদারির অভাব অনিয়মকে উৎসাহিত করেছে।

চউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পরিকল্পিত, নিরাপদ ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে।

নগরের কোথাও নকশাবহির্ভূত কিংবা অবৈধ ভবন নির্মাণ কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।

ভবন মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যারা অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ করেছেন, তারা স্বেচ্ছায় অবৈধ অংশ অপসারণ করুন।

অন্যথায় আইন অনুযায়ী চউক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।

অভিযানে চউকের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হামীমুন তানজীন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।

ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন চউকের অথরাইজড অফিসার-২ কাজী কাদের নেওয়াজ।

এ সময় সহকারী অথরাইজড অফিসার আসাদ বিন আনোয়ার, সহকারী অথরাইজড অফিসার ফারুক আহাম্মদ এবং সংশ্লিষ্ট ইমারত পরিদর্শকেরা উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রামে অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক এই অভিযান শুধু কয়েকটি ভবনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, নির্মাণ তদারকি এবং আইনের প্রয়োগ—এই তিনটি ক্ষেত্রের দীর্ঘদিনের বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

গত ৫–১০ বছরের অভিযানের ইতিহাস

চউকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ ও নকশাবহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান নতুন নয়। গত এক দশকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে।

বিশেষ করে পাহাড়তলী, আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ, খুলশী ও চান্দগাঁও এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালিয়ে ভবন মালিকদের জরিমানা, সিলগালা এবং অবৈধ অংশ ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে প্রতিবার অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও পরে আবার নতুন করে অনিয়ম শুরু হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অবৈধ ভবনের পরিসংখ্যান

চউকের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, চট্টগ্রাম নগরে কয়েক হাজার ভবনের বিরুদ্ধে নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের ভবন নির্মাণে বাধ্যতামূলক সেটব্যাক না রাখা, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, সড়ক ও নালার নির্ধারিত দূরত্ব অমান্য করা এবং অনুমোদন ছাড়া ভবন সম্প্রসারণের মতো অনিয়ম পাওয়া গেছে।

যদিও চউক এখনো হালনাগাদ পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেনি, কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে নগরের বড় অংশের ভবন কোনো না কোনোভাবে অনুমোদিত নকশা থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

বহুল আলোচিত ভবন ও অগ্রগতি

অতীতে নগরের একাধিক বহুল আলোচিত ভবনের বিরুদ্ধে চউক ব্যবস্থা নিয়েছিল। কয়েকটি বাণিজ্যিক ভবনের অবৈধ তলা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং কিছু ভবন সাময়িকভাবে সিলগালা করা হয়েছিল।

তবে অনেক ক্ষেত্রে ভবন মালিকেরা আদালতের শরণাপন্ন হওয়ায় আইনি জটিলতায় অভিযান দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।

ফলে নির্দেশ জারি হলেও সব ভবনের অবৈধ অংশ দ্রুত অপসারণ করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও মামলা

চউক কর্মকর্তারা বলছেন, নকশাবহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে নেওয়া অনেক পদক্ষেপ উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে আদালত নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেও, যথাযথ নোটিশ, শুনানি ও প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিচারকেরা।

ফলে প্রতিটি অভিযানের আগে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাকে এখন চউক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতামত

নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিরা মনে করেন, শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাদের মতে, নির্মাণ শুরুর সময় থেকেই ডিজিটাল মনিটরিং, নিয়মিত পরিদর্শন এবং অনুমোদিত নকশা অনলাইনে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের মতে, ভবনের চারপাশে খালি জায়গা না রাখা এবং অনুমোদনের বেশি তলা নির্মাণ শুধু আইন ভঙ্গ নয়, বরং অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প ও জরুরি উদ্ধারকাজের ক্ষেত্রেও বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

কেন বছরের পর বছর অবৈধ ভবন গড়ে ওঠে

নগর বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামে অবৈধ ভবন নির্মাণের পেছনে কয়েকটি কারণ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে তদারকির ঘাটতি, নির্মাণকাজ চলাকালে নিয়মিত পরিদর্শনের অভাব, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপ, আইনের ধীর প্রয়োগ এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়েই অনিয়ম বন্ধ করা গেলে পরে ভবন ভাঙার মতো কঠোর পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

আজকের অভিযানের পর এখন দেখার বিষয়, অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চউক ভবিষ্যতে নিয়মভঙ্গের প্রবণতা কতটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে, আর একই সঙ্গে নির্মাণের শুরু থেকেই কার্যকর তদারকির মাধ্যমে নতুন অনিয়মের পথ কতটা বন্ধ করতে সক্ষম হয়।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ