চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ১৪ আগস্টের সেই সকালটি এখনো নিহত শ্রমিকদের পরিবারের কাছে দুঃস্বপ্ন।
একটি জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকে কাজ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে একে একে প্রাণ হারান ১০ শ্রমিক। কিন্তু তিনটি সরকারি সতর্কতা, একটি শ্রম আদালতের মামলা, পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, গ্যাস-ফ্রি সনদ নিয়ে প্রশ্ন এবং শ্রমিক তালিকায় অসঙ্গতির তথ্য সামনে আসার পর এখন প্রশ্ন উঠছে-এটি কি শুধু একটি দুর্ঘটনা, নাকি একের পর এক সতর্কবার্তা উপেক্ষার পরিণতি?
সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের “গুরুতর নিরাপত্তা ঘাটতি ও অবহেলা” চিহ্নিত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় শ্রমিকদের গ্যাস মাস্ক বা SCBA ছিল না। সেদিন ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন।
ইয়ার্ডে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক কিংবা জরুরি উদ্ধারকারী দলও ছিল না। তদন্ত কমিটি এসব কারণকে নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনার গুরুতর দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে মালিকের বিরুদ্ধে Ship Breaking and Recycling Rules, 2011 অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
আর এই মৃত্যুর ঠিক এক মাস আগে-১৫ জুলাই-কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল।
তারও আগে ২ ফেব্রুয়ারি নিরাপত্তা ঘাটতি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়, ৪ মে পুনঃপরিদর্শনে ঘাটতি বহাল পাওয়া যায় এবং ৮ জুন আবারও নির্দেশ দেওয়া হয়।
সরকারি তদন্ত কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য রাখা LNG carrier MT Rasi-এর একটি ব্যালাস্ট ট্যাংকে শ্রমিকেরা কাজ করছিলেন।
সেদিন নিয়োজিত শ্রমিকদের হাতে পর্যাপ্ত গ্যাস মাস্ক বা SCBA ছিল না। এমনকি উদ্ধারকারীদের ক্ষেত্রেও যথাযথ শ্বাস-সুরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি ছিল। ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক কিংবা জরুরি উদ্ধার দলও ছিল না।
প্রথমে ঘটনাস্থলেই কয়েকজন শ্রমিক মারা যান। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০।
দুর্ঘটনার পরপরই ইয়ার্ডটির কার্যক্রম স্থগিত ও সিলগালা করার নির্দেশনা আসে এবং আদালত থেকেও সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আদালতের নির্দেশনাকে তোয়াক্কা না করেই নেপথ্যে কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা এবং সার্বিক পরিদর্শনের নামে মূল অপরাধ আড়াল করার অভিযোগ উঠেছে।
পরিবেশগত ছাড়পত্রের (Environmental Clearance) মেয়াদ গত ১২ আগস্ট ২০২৬ শেষ হওয়া সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই কারখানা চালানো হচ্ছিল।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের একাধিক নির্দেশনার পরও মালিকপক্ষ ন্যূনতম নিরাপত্তা মানদণ্ড অর্জন করেনি।
বিষাক্ত ‘রাসি’ জাহাজটিকে গ্যাস-মুক্তকরণ (Gas-Free Certification) না করেই কাটার অনুমতি কীভাবে মিলল-সে প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর আজও অধরা।
দুর্ঘটনার পর গণমাধ্যমের সামনে নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বড় বড় ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে তার সিংহভাগই মেলেনি। ১০টি পরিবারের কাঁধে এখন অভাব ও স্বজন হারানোর শোকের দ্বিগুণ বোঝা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্ষতিপূরণের বকেয়া টাকা দাবি করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নানা আইনি ও সামাজিক ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে কিছুই পাওয়া যাবে না’-এমন হুমকির মুখে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সদস্যরা। সুবিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরে এখন তারা দিশেহারা।
আইনি সংকট থেকে বাঁচতে ও সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিতে সরকারি উচ্চপর্যায়ের কতিপয় কর্মকর্তা ও মন্ত্রী-আমলাদের দিয়ে ইয়ার্ডে বিশেষ ‘পরিদর্শন সাজানো’র অভিযোগ উঠেছে।
অনিয়মে জর্জরিত এই স্থানটিকে হঠাৎ ‘শৃঙ্খল ও নিয়ম মেনে চলা ইয়ার্ড’ হিসেবে জাহির করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
একই সঙ্গে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে রুদ্ধ করতে এবং প্রকৃত চিত্র আড়াল করতে কতিপয় সুযোগ সন্ধানী গণমাধ্যমকর্মীকে বিশেষ সুবিধায় ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ উঠেছে।
যার ফলে দুর্ঘটনার মূল কারণ ও মালিকপক্ষের প্রত্যক্ষ অবহেলার বিষয়টি মূলধারার আলোচনা থেকে সরিয়ে নেওয়ার একটা সুসংগঠিত চক্রান্ত স্পষ্ট।
দুর্ঘটনার পর BSRB ফেরদৌস স্টিলের সব কার্যক্রম স্থগিত করে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ড বন্ধ রাখার কথা জানায়।
তবে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বন্ধ ইয়ার্ডগুলো শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর পুনরায় চালু করা হবে। একই সময়ে ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ড পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও তিনি বলেন।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার শীতলপুরে পিএইচপি শিপইয়ার্ড ও কবির স্টিল রিসাইক্লিং ইয়ার্ড পরিদর্শন শেষে মতবিনিময়কালে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডে সম্প্রতি দুর্ঘটনায় ১০ শ্রমিক নিহত হন।
এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর ফলে প্রায় অর্ধশত শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এসব শ্রমিকের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বন্ধ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান মন্ত্রী।
তবে শিল্পের বিকাশের সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।
এসময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাহবুব আলম এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) প্রেসিডেন্ট মো. মহসিনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ইয়ার্ড চালু হয়নি, বরং পুনরায় চালুর প্রস্তুতি/প্রক্রিয়ার কথা প্রকাশ্যে এসেছে।
এদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ‘লেবার ইন্সপেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন’ (LIMA)-এ ডিজিটালাইজেশনের দোহাই দিয়ে কাগজে-কলমে কারখানাটিকে সুশৃঙ্খল হিসেবে দেখানোর ডিজিটাল চক্রান্ত ধরা পড়েছে।
অ্যাপ্লিকেশনে শ্রমিক সংখ্যা, কাজের পরিবেশ এবং দৈনিক নিরাপত্তা চেকলিস্ট সংক্রান্ত যে তথ্য আপলোড করা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কতজন নিয়োজিত ছিলেন এবং তাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (PPE) ছিল কিনা-তা সম্পূর্ণ অসত্যভাবে নিবন্ধিত করা হয়েছে, যা শ্রম আইন ২০০৬-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে জঘন্য প্রতারণা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে যা ঘটেছে তা স্রেফ কোনো ‘দুর্ঘটনা’ নয়, এটি অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের সামিল।
পেনাল কোডের ৩০৪ (ক) ধারা অনুযায়ী অবহেলার কারণে ঘটিত প্রাণহানির ঘটনায় মালিকপক্ষের সরাসরি দায়বদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (ধারা ১৫১ ও ৩১২) অনুযায়ী কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা, অসত্য তথ্য প্রদান এবং দুর্ঘটনা পরবর্তী আইনানুগ ক্ষতিপূরণ আটকে রাখা ফৌজদারি অপরাধ।
তাছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ বলছে মেয়াদোত্তীর্ণ ছাড়পত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ও গ্যাসীয় জাহাজ প্রক্রিয়াজাতকরণ পরিবেশগত গুরুতর অপরাধ।
১০ জন শ্রমিকের জীবন কি শুধুই কয়েকটি সংবাদ শিরোনাম আর মালিকপক্ষের প্রভাবের কাছে বলি হওয়ার জন্য?
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং সচেতন সুশীল সমাজ কি এই সংঘবদ্ধ অনিয়ম দেখেও নীরব থাকবে?
কাগজে-কলমে মিথ্যা তথ্য জমা দিয়ে, প্রভাবশালী মহলকে পাশে বসিয়ে এবং নিহতদের স্বজনদের ভয়ে স্তব্ধ করে দিয়ে পার পাওয়ার এই চেষ্টা বন্ধ হতে হবে।
জনস্বার্থে ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের বিচারিক তদন্ত কমিটি গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।




