বাবুর গোপন সংসার, ১৪ বছর পর কেন সামনে জাপানি স্ত্রী ও দুই কন্যা?

অনলাইন ডেস্ক

বিয়ে হয়েছিল যুক্তরাজ্যে। সময়টা ১৯৯২ সাল। কনের নাম মিনাকো কাওয়ারাজাকি। বর বাংলাদেশের পরিচিত ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর জন্ম নেয় তাদের প্রথম কন্যা নীনা কাওয়ারাজাকি।

- Advertisement -

এরপর কেটে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু মারা গেছেন ২০১২ সালের ৪ নভেম্বর। কিন্তু তার মৃত্যুর প্রায় ১৪ বছর পর পুরোনো সেই পারিবারিক অধ্যায়ই নতুন করে আলোচনায় এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে। সম্প্রতি একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর বিষয়টি জনসম্মুখে আসে।

- Advertisement -
google news follower

তবে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের আনোয়ারা-কর্ণফুলী এলাকার আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলছেন, বিষয়টি তাদের কাছে নতুন নয়।

তাদের দাবি, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু জীবিত থাকতেই তার দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানদের বিষয়টি পারিবারিকভাবে মীমাংসা করা হয়েছিল। এমনকি তাদের সম্পত্তির অধিকারও দেওয়া হয়েছিল।

- Advertisement -
islamibank

তাহলে এত বছর পর কেন আবার আলোচনায় এলো সেই পুরোনো সম্পর্ক?

উত্তর খুঁজতে সামনে আসছে একের পর এক নথি, পুরোনো স্মৃতি, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সম্পত্তিসংক্রান্ত একটি আর্থিক নথির সূত্র।

যুক্তরাজ্যে বিয়ে, সনদে বাবুর নাম

প্রকাশিত প্রতিবেদনে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর জাপানি স্ত্রীর নাম মিনাকো কাওয়ারাজাকি এবং বড় মেয়ের নাম নীনা কাওয়ারাজাকি উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের ২১ আগস্ট যুক্তরাজ্যে মিনাকোকে বিয়ে করেন বাবু। ওই বছরের ১৯ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যেই তাদের প্রথম কন্যা নীনার জন্ম হয়। ছোট মেয়ের নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

এই বিয়ের বিষয়টির পক্ষে একটি নথির কথাও সামনে এসেছে। ঢাকার জাপান দূতাবাস ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ বিয়ের একটি সনদ ইস্যু করে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সনদে স্বামীর নাম লেখা হয়েছে চৌধুরী আখতারুজ্জামান এবং স্ত্রীর নাম মিনাকো কাওয়ারাজাকি। সেখানে বিয়ের তারিখ ২১ আগস্ট ১৯৯২ এবং বিয়ের স্থান যুক্তরাজ্য হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

নথিতে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর জন্মতারিখ ৩ মে ১৯৪৫ এবং মিনাকো কাওয়ারাজাকির জন্মতারিখ ২২ মার্চ ১৯৬০ উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, বহু বছর আগের একটি পারিবারিক সম্পর্কের অস্তিত্বের বিষয়ে শুধু রাজনৈতিক মহলের কথাই নয়, সরকারি নথির কথাও সামনে এসেছে।

জন্মসনদে বাবার নাম আখতারুজ্জামান

কাহিনির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নীনা কাওয়ারাজাকিকে ঘিরে। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল হংকংয়ে জাপানের কনস্যুলেট জেনারেল থেকে ইস্যু করা একটি জন্মসনদের তথ্যও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সেখানে নীনা কাওয়ারাজাকির জন্মস্থান যুক্তরাজ্য এবং জন্মতারিখ ১৯ ডিসেম্বর ১৯৯২ উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে তার পিতার নাম আখতারুজ্জামান চৌধুরী এবং মাতার নাম কাওয়ারাজাকি মিনাকো লেখা রয়েছে।

সম্পর্কের ঘরে নীনাকে প্রথম কন্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একদিকে ১৯৯২ সালের বিয়ের তথ্য, অন্যদিকে একই বছরের ডিসেম্বরে জন্ম নেওয়া কন্যার নথিতে বাবার নাম আখতারুজ্জামান চৌধুরী-পুরোনো সেই সম্পর্কের বিষয়ে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব নথি।

১৪ বছর পর কেন সামনে এলো বিষয়টি?

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ২০১২ সালের ৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মারা যান।

তার মৃত্যুর প্রায় ১৪ বছর পর, গত ২৩ সেপ্টেম্বর বড় মেয়ে নীনা একটি ব্যাংকে এক কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের-এফডিআর-অর্থ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেন।

প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই নথির সূত্র ধরেই বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। সেখান থেকেই যেন খুলতে থাকে পুরোনো এক পারিবারিক অধ্যায়ের দরজা।

একটি বিয়ে। দুই কন্যার অস্তিত্বের দাবি। সম্পত্তির প্রসঙ্গ। ব্যাংকের অর্থ। আর সবকিছুর কেন্দ্রে প্রায় দেড় দশক আগে প্রয়াত একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর নির্বাচনী এলাকা আনোয়ারা-কর্ণফুলীর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা দাবি করেছেন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানদের বিষয়টি বাবুর জীবদ্দশাতেই পারিবারিকভাবে মীমাংসা হয়েছিল।

কর্ণফুলী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি নাজিম উদ্দিন হায়দার বলেন, বাবু জীবিত থাকতেই ওই স্ত্রী ও সন্তানদের সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা করে দিয়েছিলেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর এক যুগেরও বেশি সময় পর বিষয়টি সামনে এনে সামাজিকভাবে বাবুকে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অর্থাৎ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে বিষয়টি কোনো নতুন পারিবারিক বিরোধ নয়, বরং বহু আগেই নিষ্পত্তি হওয়া একটি বিষয়কে নতুন করে আলোচনায় আনা হচ্ছে।

তবে এ দাবির বাইরে সম্পত্তি বণ্টনের সুনির্দিষ্ট নথি বা তার পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত প্রতিবেদনে সামনে এসেছে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

অন্যদিকে, দক্ষিণ জেলা বিএনপির কয়েকজন নেতা প্রশ্ন তুলেছেন ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের হলফনামা নিয়ে। তাদের বক্তব্য, ওই হলফনামায় দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানদের তথ্য না থাকার বিষয়টি প্রশ্ন তৈরি করে।

তবে বিএনপির স্থানীয় নেতা শরীফ মোহাম্মদ কামাল বলেন, কেন ওই তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি, তা তাদের জানা নেই। তার মতে, বিষয়টি মূলত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক।

ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছ থেকে কোনো নিশ্চিত ব্যাখ্যা সামনে আসেনি।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক জীবনের সঙ্গে পরিচিতদের কাছে তার প্রথম সংসারের বিষয়টি বহুল পরিচিত।

প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক বাবু চট্টগ্রামের শিল্পোদ্যোক্তা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মেয়ে নূর নাহার জামানকে বিয়ে করেছিলেন। এই সংসারে তাদের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে।

তাদের বড় সন্তান সাইফুজ্জামান চৌধুরী পরবর্তীতে বাংলাদেশের ভূমিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অর্থাৎ, বাবুর পারিবারিক পরিচয়ের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই জনপরিচিত ছিল। কিন্তু জাপানি স্ত্রী ও দুই কন্যাকে ঘিরে যে অধ্যায়টি এখন আলোচনায় এসেছে, সেটি ছিল তুলনামূলকভাবে আড়ালে।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর পরিচয় শুধু একজন ব্যবসায়ী হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘদিন তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হন।

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সর্বশেষ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজামকে পরাজিত করেন।

বর্তমানে সরওয়ার জামাল নিজাম চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য।

রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসায়ও বাবুর ছিল শক্ত অবস্থান। তিনি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি এবং এশিয়া প্যাসিফিক চেম্বারের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

ফলে তার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো তথ্য প্রকাশ্যে এলে সেটি শুধু পারিবারিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া তৈরি করা স্বাভাবিক।

বাবুর জীবনে ১৯৯২ সালটি শুধু বিয়ের কারণে আলোচিত নয়। ওই বছর হুমায়ুন জহির হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পর তিনি বিদেশে চলে যান। পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে রাজনীতি ও ব্যবসায় সক্রিয় হলেও আগের অবস্থান পুরোপুরি ফিরে পাননি বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।

একই বছর তার জীবনে একদিকে মামলা ও বিদেশযাত্রা, অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে বিয়ের ঘটনা-দুটি আলাদা অধ্যায় পাশাপাশি অবস্থান করছিল।

তবে সেসবের কতটা প্রকাশ্যে ছিল, আর কতটা ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল, সেটিই এখন নতুন করে আলোচনার বিষয়।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ