চট্টগ্রামের আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা ছিল কি না, তা হয়তো বাইরের কথা। কিন্তু শনিবার (৪ জুলাই) বন্দরনগরীর নেভি কনভেনশন সেন্টারের ভেতরটা মুখরিত ছিল এক অন্যরকম আলোড়নে। সে আলোড়ন মনের ভেতরের মেঘ কাটার, মনকে চেনার।
আমরা কি আসলেই আমাদের শিশুদের মন খারাপের খবর রাখি? নাকি ‘বাচ্চা মানুষের আবার কিসের দুশ্চিন্তা’ এই চিরন্তন অবহেলায় পার করে দিই তাদের সোনালী সময়টা?
ঠিক এই প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখেই চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক ব্যতিক্রমী আয়োজন ‘Mental Health Ambassador 2026 Chattogram’।
লাইফস্প্রিং কনসালটেন্সি লিমিটেড (LifeSpring Consultancy Ltd.) এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সংবেদনশীল কর্মসূচিতে অংশ নেন সমাজ ও পেশার নানা স্তরের প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ।
উদ্দেশ্য একটাই মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক মানসিক সহায়তার দীক্ষা নিয়ে নিজের পরিবার ও সমাজের জন্য একজন ‘মানসিক স্বাস্থ্য দূত’ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।
আজকের প্রতিযোগিতার যুগে তিন বছরের একটা ছোট্ট শিশুও যে তীব্র মানসিক চাপে ভুগতে পারে, তা হয়তো আমরা অনেকেই মানতে চাই না।
দেশের খ্যাতনামা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুনমুন জাহান তাঁর আলোচনায় ঠিক এই জায়গাটিতেই আলো ফেলেছেন।
তিনি তিন বছরের শিশুর দুশ্চিন্তা, মননশীলতা (Mindfulness) এবং মানসিক সুস্থতার গভীর গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর সেশনের সবচেয়ে জাদুকরী মুহূর্তটি আসে একদম শেষে।
হলভর্তি পাঁচ শতাধিক মানুষকে নিয়ে তিনি যখন একটি যৌথ মেডিটেশন বা ধ্যান পরিচালনা করেন, তখন পুরো মিলনায়তনে নেমে আসে এক অদ্ভুত, শান্ত পিনপতন নীরবতা। যেন প্রত্যেকে ক্ষণিকের জন্য হলেও নিজেদের ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ভুলে নিজের মনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন।
“শিশুর মন কোনো মাটির খেলনা নয় যে ভেঙে গেলে আবার জুড়ে দেওয়া যাবে। এর যত্ন নিতে হয় একদম প্রথম দিন থেকে।”
অনুষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধাপগুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেন ডা. আরাফাত আজিম।
অন্যদিকে, অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ ও ভিজ্যুয়াল স্লাইড উপস্থাপনার মাধ্যমে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলিত দিকগুলো এবং এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতার জরুরি প্রয়োজনীয়তা ফুটিয়ে তোলেন ডা. মৌমিতা পাল।
এই আয়োজন কেবল কোনো তাত্ত্বিক সেমিনার ছিল না, বরং তা রূপ নিয়েছিল এক সামাজিক মহাসম্মেলনে।
প্রায় ৫০০ জনের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে দিনভর ট্রেনিং এ প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. মুনমুন জাহান, লাইফস্প্রিং চট্টগ্রাম ব্রাঞ্চের সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. আরাফাত আজিম, ডা. মৌমিতা পাল, ডা. শাফিকা আফরোজ, ডা. মাশ্রুরা মাহজাবিন, ডা. তাসনুভা মাহবিন এবং সাইকোলজিস্টদের মধ্যে ছিলেন ইমরান হোসাইন, সাবিনা আক্তার এবং আফরোজা আফরিন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন, আল হিদায়া ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, বাংলাদেশ নৌবাহিনী স্কুল অ্যান্ড কলেজ চট্টগ্রাম, নেভী অ্যাংকারেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রোভার্স স্কাউট, আশার আলো, শিশু নিকেতন, ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ESDO)-এর প্রতিনিধিবৃন্দ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সমাজের মূল চালিকাশক্তি সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষক, পুলিশ ও নৌবাহিনীর কর্মকর্তাসহ নানা শ্রেণি-পেশার সংবেদনশীল মানুষ এক ছাদের নিচে এসেছিলেন শিশুর মনের ভাষা বুঝতে।
আয়োজকেরা জানান, এই আয়োজনের মূল সার্থকতা কেবল একটি অনুষ্ঠান সফল করায় নয়, বরং এখানে আসা প্রতিটি মানুষকে একেকজন Mental Health Ambassador বা ‘মানসিক স্বাস্থ্য দূত’ হিসেবে তৈরি করা।
যেন এখান থেকে ফিরে গিয়ে তাঁরা নিজ নিজ পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে পারেন, ভাঙতে পারেন এই বিষয়ে জমে থাকা সামাজিক জড়তা (Taboo)।
চট্টগ্রামের এই বিকেলটি হয়তো শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু পাঁচ শতাধিক মানুষের মনে যে সচেতনতার বীজ বুনে দেওয়া হলো, তা আগামী দিনে এক সুস্থ ও সুন্দর মানসিকতাসম্পন্ন প্রজন্ম গঠনে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার।




