বন্দর বলছে কর ১৫ কোটির কম, চসিক চায় ২৬৪ কোটি-বিরোধ প্রকাশ্যে

অনলাইন ডেস্ক

চট্টগ্রাম বন্দরের গৃহকর নিয়ে বহুদিনের চাপা টানাপোড়েন এবার প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের প্রকৃত গৃহকর ১৫ কোটি টাকারও কম। অথচ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) বছরে ২৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা গৃহকর দাবি করে নোটিশ ধরিয়ে দিয়েছে।

- Advertisement -

দুই পক্ষের বিপরীতমুখী অবস্থানে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও দেশের অন্যতম বৃহৎ নগর প্রশাসনের মধ্যে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়েছে।

- Advertisement -
google news follower

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় চসিকের নির্ধারিত কর পরিশোধের নির্দেশনা দিলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনো আপত্তিতে অনড়।

ফলে গৃহকর ইস্যুতে প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের পাশাপাশি নতুন করে আলোচনায় এসেছে নগর অবকাঠামোর ব্যবহার, করনীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

- Advertisement -
islamibank

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন গত ৩ মে আপিল শুনানি শেষে বন্দরের বার্ষিক গৃহকর ২৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা নির্ধারণ করে।

শুনানিতে মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ দুই সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরদিন ৪ মে বন্দর কর্তৃপক্ষকে নতুন কর পরিশোধের নোটিশ দেওয়া হয়।

চসিকের দাবি, যৌথ জরিপ অনুযায়ী বন্দরের ১ কোটি ৭৩ লাখ বর্গফুট স্থাপনার বিপরীতে আইন অনুযায়ী গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই হিসাবকে ‘অবাস্তব’ ও ‘বিধিবহির্ভূত’ বলে দাবি করছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের আপিল আবেদনে বলা হয়েছে, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (ট্যাক্সেশন) রুলস, ১৯৮৬ অনুসারে সঠিকভাবে কর নির্ধারণ করা হয়নি।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, যৌথ জরিপে নির্ধারিত স্থাপনার বিপরীতে গৃহকর হওয়া উচিত ১৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। অথচ বর্তমানে তারা বছরে ৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করছে, যা প্রকৃত করের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি।

বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও উল্লেখ করেছে, পাঁচ বছর অন্তর গৃহকর পুনর্মূল্যায়নের বিধান রয়েছে। সে হিসাবে নতুন কর কার্যকর হতে পারে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে। বর্তমান অর্থবছরে নতুন করে এই কর চাপানো বিধিসম্মত নয় বলেও দাবি তাদের।

অন্যদিকে চসিক বলছে, এতদিন বন্দর কর্তৃপক্ষ বাস্তবতার তুলনায় অনেক কম গৃহকর দিয়েছে। নগরের অবকাঠামো সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেও তারা ন্যায্য কর পরিশোধ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে।

সম্প্রতি নগরের এক অনুষ্ঠানে মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম নগরের অধিকাংশ সড়কের ধারণক্ষমতা ১০ টন হলেও বন্দরের ৪০ থেকে ৫০ টনের ভারী যানবাহন নিয়মিত চলাচল করছে।

এতে নগরের সড়ক ও সেতু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ সেই বন্দর কর্তৃপক্ষই চসিকের ন্যায্য পাওনা গৃহকর দিতে আপত্তি তুলছে।

চসিক সূত্র জানায়, গৃহকর নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে গত বছরের ১৪ আগস্ট আট সদস্যের একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়।

ওই কমিটির জরিপে বন্দরের স্থাপনার আয়তন নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ৭৩ লাখ বর্গফুট। পরে সেই হিসাব অনুযায়ী গৃহকর দাঁড়ায় ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পঞ্চবার্ষিক কর পুনর্মূল্যায়নে বন্দরের গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১৬০ কোটি টাকা।

তবে বন্দরের আপত্তির মুখে সাবেক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর সময়ে সমঝোতার ভিত্তিতে তা কমিয়ে ৪৫ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়। পরে মেয়র শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর পুনরায় পূর্ণাঙ্গ কর আদায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গৃহকর নির্ধারণ নিয়ে নির্দেশনা চেয়ে গত ১৩ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। জবাবে ২২ এপ্রিল মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (ট্যাক্সেশন) রুলস, ১৯৮৬ অনুযায়ী কর নির্ধারণের এখতিয়ার চসিকের। একই সঙ্গে চসিক নির্ধারিত গৃহকর পরিশোধ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

তারপরও নতুন কর পরিশোধে কার্যত অনীহা দেখাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকেই কর পরিশোধে বিরত রয়েছে সংস্থাটি।

চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, শুনানিতে বন্দরের পক্ষ থেকে আবার কর পুনর্মূল্যায়নের দাবি করা হলেও বিধি অনুযায়ী সেই সুযোগ নেই।

তবে তারা চাইলে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত গৃহকরের ৭৫ শতাংশ আগে জমা দিতে হবে।

অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্বে) সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, তারা নতুন গৃহকরের নোটিশ পেয়েছেন। বিষয়টি বিধি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভর করে দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আবার এই বন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রমের চাপই সবচেয়ে বেশি পড়ে চট্টগ্রাম নগরের সড়ক, ড্রেনেজ ও অবকাঠামোর ওপর।

ফলে গৃহকর নিয়ে এই বিরোধ এখন শুধু অর্থ আদায়ের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, নগর ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক দায়িত্ববণ্টনের বড় প্রশ্ন হিসেবেও সামনে চলে এসেছে।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ