টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে যেন শঙ্কার শহরে পরিণত হয়েছে রাঙামাটি। পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে তৈরি হয়েছে ধসের ঝুঁকি, একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা খালি করার ঘোষণা দিচ্ছে প্রশাসন, আর এর মধ্যেই পৃথক দুটি মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই ব্যক্তি।
মঙ্গলবার বাঘাইছড়িতে পাহাড়ধসে নিহত হয়েছেন লক্ষী বিলাস চাকমা (৭০)। একই দিনে লংগদুতে নিজ বাড়ির বিদ্যুতের লাইনে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান দিনমজুর বেনসন চাকমা (৩০) ওরফে বদক্যা চাকমা।
নিম্নচাপের প্রভাবে টানা বর্ষণে রাঙামাটির জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ পাহাড়ধস নিয়ে।
২০১৭ সালের ভয়াবহ ট্র্যাজেডির স্মৃতি এখনো মানুষের মনে তাজা। সেই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে এবার কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না প্রশাসন।
সকাল থেকেই জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাঠে কাজ করছেন।
ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, রেড ক্রিসেন্ট, রোভার স্কাউট, উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে।
ইতোমধ্যে জেলার ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যদিও এখনো সেখানে মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক কম, তবে সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবারগুলো আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে শুরু করেছে।
মঙ্গলবার সকালে বাঘাইছড়ি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম লাল্যাঘোনা এলাকায় কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে যায়।
দুপুরে হঠাৎ পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে মাটিচাপা পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা লক্ষী বিলাস চাকমা।
স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করলেও ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে একই দিন সকাল ১১টার দিকে লংগদু উপজেলার মহাজনপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ির বিদ্যুতের সংযোগ লাইনে কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন বেনসন চাকমা ওরফে বদক্যা চাকমা।
তিনি উপজেলার মহাজনপাড়া এলাকার নীল কান্তি চাকমার ছেলে এবং পেশায় দিনমজুর ছিলেন। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
লংগদু থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাকারিয়া জানান, ঘটনাটি সম্পর্কে পুলিশ অবগত রয়েছে এবং এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা রুজুর প্রক্রিয়া চলছে।
একই সময়ে রাঙামাটি পৌরসভার শিমুলতলী এলাকায়ও একটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। তবে প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে সেখান থেকে মানুষজনকে সরিয়ে নেওয়ায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রাঙামাটি শহরের ২৮টি এলাকা ইতোমধ্যে পাহাড়ধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পাশাপাশি কাউখালী ও কাপ্তাই উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকেও বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
গত রোববার থেকেই জেলা প্রশাসন ও রাঙামাটি পৌরসভা মাইকিং করে মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছাড়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রাঙামাটি শহরের লোকনাথ মন্দির আশ্রয়কেন্দ্রে ২১ পরিবারের প্রায় ৭০ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
অন্যদিকে কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া আরটিএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে ২০টি পরিবারের নারী, পুরুষ ও শিশুরা অবস্থান করছেন।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি বলেন, বৈরী আবহাওয়ায় সম্ভাব্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাঠপর্যায়ে অভিযান চলছে।
তিনি সবাইকে পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালে অবস্থান না করার পাশাপাশি বিদ্যুতের সংযোগ বা লাইনে কাজ করার সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রয়োজনে দক্ষ ব্যক্তির সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানান।
আবহাওয়ার উন্নতি না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন।
তাই শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা না করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।




